সত্যি ডাকাতির গল্প – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়

কটা সত্যি ডাকাতির ঘটনা বলছি। তখন আমি মামারবাড়িতে থাকি, বেশ ছোট। মামারবাড়ি বাঘাটী নামে এক গ্রামে। গ্রামটা হুগলি জেলার ডানকুনি ছাড়িয়ে মশাট শিয়াখালার লাইনে। একেবারে পল্লী বলতে যা বোঝায় তাই। চারিদিকে সবুজ মাঠ, ঘন গাছগাছালি। বিশাল বিশাল পুকুর। কোথাও বা ঘনতম জঙ্গল। তখন আমার ছেলেবেলা। গ্রামে তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। হ্যারিকেনের আলোই ঘরে ঘরে জ্বলত। গ্রামীণ রাত যখন নিঃশব্দ পায়ে নেমে আসত তখন সারা গ্রামটাই শ্মশানের মত হয়ে যেত। মামারবাড়িটা ছিল গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে। মামাদের বিশাল অবস্থা। দাদুরা তিন ভাই। তাদের ছেলে মেয়ে, স্ত্রী আমরা কয়েকজন  ভাই বোন সব মিলিয়ে দশ মামা, দশ মামী আর সকলেকে নিয়ে বিশাল পরিবার। মামারা সব্বাই শিক্ষক ছিলেন। তিন মহল বাড়িতে সারা গ্রামের মানুষের যাতায়াত ছিল। শিক্ষা আর সাংস্কৃতির মেলবন্ধন ছিল মামারবাড়িই। গ্রামে কোটা বাড়ি বলতে তিনটি। একটি মামাদের বিশাল জমিদার বাড়ির মত বাড়ি। আরেকটি অপেক্ষাকৃত ছোট পারেন দাদুদের বাড়ি। আরেকটি উত্তরপাড়ার শেষ প্রান্তে অমিয় জেঠুদের বাড়ি। সে এক দিন গেছে বটে।

যেহেতু ওমন স্তব্ধ, গাছপালা, মাঠ আর পুকুর ঘেরা পল্লী তাই ভূতের গল্পের পীঠস্থান ছিল যেন। আমরা অনুভব করেছি সেই সব ঘটনা। তবে আজ ভূতের নয়, ডাকাতির একেবারে সত্যি ঘটনার কথা বলব। সময়টা ছিল শীরকাল, পৌষমাস। একেবারে ঘন থেকে ঘনতম ঠাণ্ডা নেমে আসত বিকাল থেকেই। গায়ে মোটা সোয়েটার চাপিয়ে দেওয়া হত আমাদের। তারপর সামান্য অন্ধকার ঘনালেই বাড়ির সদর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হত। গ্রামে শীতকাল কেমন হয় যারা গ্রামে থাকেন জানেন। বিশেষ করে যে সময়ের কথা বলছি সেই সময়কালে। তখন তো গ্রামে লোক সংখ্যাও কম ছিল। মনে আছে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকত গ্রামের একমাত্র মুদির দোকান দেবা মামার দোকানটি। তারপর বন্ধ হয়ে যেত। সারা গ্রামে ক্রমে মানুষ দেখা যেত না। আমরা যখন পড়াশোনা শেষ করে খেয়েদেয়ে শোবার আগে খড়খড়ি খুলে বাইরে দেখতাম তখন ঘন কুয়াশা চারিদিক ছেয়ে ফেলত। কনকনে ঠাণ্ডায় প্রকৃতিও স্তব্ধ হয়ে যেন নেতিয়ে থাকত। এমনই এক রাত।

হঠাৎ আর্ত চিৎকার। বাড়ির সবাই উঠে পড়লেন। এ তো বছর বছরের ব্যাপার তাই সবাই বুঝতে পারলেন ডাকাত পড়েছে কারো বাড়ি। হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডাকে পরোয়া করতেন না গ্রামের লোক। কেউ না কেউ বেরিয়ে খবরটা চাউর করে দিতেন কার বাড়ি পড়েছে বলে। জানা গেল সতীশ দাদুদের বাড়ি পড়েছে। সতীশ দাদুরা বড় চাষি। তার ওপর সুদের কারবার করতেন। বাড়িতে মূলধন থাকত ভালোই। ডাকাতরা সে সন্ধান পাকা করেই হানা দিয়েছে। মামারা সর্বঅঙ্গ ঢেকে ছাদে উঠে গেলেন। বাইরে বের হবার উপায় পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ সতীশ দাদুদের বাড়ি থেকে কম দূরত্বের বাড়িগুলোর সদর দরজার কাছে টাঙি হাতে ডাকাতরা পাহারা দিত। ছাদে জমানো থাকত বালি। কুচো কুচো ইট আর প্রচুর কাঁচের টুকরো, বোতল। সেগুলো এই সময় ব্যবহার করা হত। ছাদ থেকে সদর দরজা কাছে ফেলা হত। কোনও কোনও সময় জঙ্গলঘেরা খিড়কি দরজা দিয়ে গোপনে বেরিয়ে মামারা অন্য গ্রামবাসীদের সঙ্গে মিট করে ডাকাতদলের মুখোমুখি হতেন। চলত গ্রামবাসীদের সঙ্গে ডাকাতদের এক প্রস্থ যুদ্ধ। আমরা আর মামীরা ও বাড়ির মেয়েরা দরজা জানলা বন্ধ করে কল্পনার চোখে সেই যুদ্ধ অনুভব করে ভয়ে শিউরে থাকতাম।

সতীশ দাদুদের বাড়ি থেকে ডাকাতি করে প্রায় ৩০জনের দল বাইরে বের হল। মারধর করেছে সাংঘাতিক হয়ত। কারণ যন্ত্রণার চিৎকার ভেসে আসছে বাড়ির ভিতর থেকে। তবে প্রাণে মারেনি কাউকে। আমরা তিনতলার ঘরের খড়খড়ি খুলে উঁকি মারতাম মামীদের সঙ্গে। মশালের আলোয় চারিদিক আলোকিত হয়ে থাকতে দেখতাম। মাঝে মাঝে অদ্ভুৎ আওয়াজ তুলে চিৎকার করত ডাকাতরা। গ্রামবাসীরা এক ধরণের চিৎকার তুলত। ঘন অন্ধকার মেশানো মশালের আলোয় কি হচ্ছে বোঝা যেত না। আচমকা বোম মারার আওয়াজ উঠত। তারপরই দৌড়ানোর। ক্রমে মাঝরাত কেটে যেত। তারপরই ক্লান্ত মামারা, গ্রামবাসীরা ফিরতেন। কারো গায়ে আঁচড়ানোর দাগ, কারো মাথায় কিছু লেগে রক্তপাত। কেউ বা খুঁড়িয়ে হাটতেন। তবে ডাকাতদের গ্রাম ছাড়া করতেন তারা। কোনও কোনও সময় জিনিসপত্র ফেলেও পালাত ডাকাতের দল। ভোরবেলা ক্লান্ত লড়াকুদের বাস্তব কাহিনী শুনতে শুনতে আর একবার শিহরিত হতাম সব্বাই।

ডাকাতরা চলে গেলে সতীশ দাদুদের বাড়ি হাজির হতেন সমস্ত গ্রামবাসী। তাদের সেবা চলত। ভরসা যোগানোর পালা চলত। মনে আছে বৃদ্ধ সতীশ দাদু ভাঙা চেয়ারে বসে কান্নার সুর তুলে বলতেন,  আমার সর্বস্ব গেল। তার ছেলে বউ, বউমারা ভয়ে চোখ বড় বড় করে তখনও সম্মোহিতের মত বসে থাকতেন। গ্রামের মহিলা ও পুরুষরা তাদের অনেক কষ্টে ঠিকঠাক করতেন আবার। দিনেরবেলা আমরা ছোটরা ডাকাতির চিহ্ন দেখতে যেতাম আর ভয়ে থরহরি কম্পনে ভুগতাম। ভোলা যায় না এসব ঘটনার কথা।
(তবে শেষ নয়। আরো ডাকাতির বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা পরে শোনানো যাবে।)


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment