সেরা দুই শিক্ষিকা – রুমাশ্রী সাহা চৌধুরী

‘মা ফেসবুক খুলেছিলে?’
‘না রে খোলা হয়নি।’
‘আরে একবার খুলেই দেখনা?’
‘আমার কি তোর মত অখন্ড সময় নাকি,সকাল থেকে রাজ‍্যের কাজ। সব সারি আগে, তারপর খুলবো।’
‘যাহ্ তাহলে তো মিস্ করে গেলে,আচ্ছা আমি দেখাচ্ছি।’
মেয়েকে এত উত্তেজিত দেখে চোখ রাখে ফেসবুকে অনুরাধা। ওহ্ বাবলির ছবি,বাবলি মানে ওর দিদির ছেলের বৌ। বছর তিনেক বিদেশে আছে। নিত‍্য নতুন ছবি আপলোড করে আজ সমুদ্রে তো কাল পাহাড়ে। ভালোই আছে, বিয়ের পর দুবছর শ্বশুরবাড়িতে কাটাতে না কাটাতেই একদম ছেলেটাকে ট‍্যাঁকে বেঁধে সোজা বিদেশে। আর তারপর থেকেই নিত‍্য নতুন প্রোফাইল স্ট‍্যাটাস আপডেট করছে,কখনো ফ্রকে আবার কখনো হটপ‍্যান্টে। বেচারা দিদিটা,খারাপ লাগে মানুষটার জন‍্য। আজ আবার কি নতুন ছবি দিয়েছে কে জানে,হয়ত বিকিনি পরা ছবি,তাই পলির এত উচ্ছ্বাস।
….’ আরে ডালের সিটি বাজলো,দেখালে দেখা।”….’এই দেখো,বৌদিভাই কি বিরাট সম্মান দিয়েছে মাম্মানকে। পারেও বটে,একদম গ্ৰেট পলিটিশিয়ান।’..মোবাইলের স্ক্রীনে চোখ রাখে অনুরাধা আরে এটা তো সেই বৌভাতের দিন তোলা পুরোনো ছবিটা। দুই মাকে নিয়ে গলা জড়িয়ে বাবলি মানে ওদের বৌমার তোলা ছবি।
এই ছবি তো এর আগে দেখেছে,এখনকার দিনে তো শুধু ছবিরই ছড়াছড়ি। নতুন বৌ নেচে বেড়িয়ে একবার এর সাথে আরেকবার ওর সাথে ছবি তুলে বেড়াচ্ছে। বিরক্ত হয়ে চলে যাবার উদ‍্যোগ নিলো।
….” এই যে সুপারমম চশমাটা চোখে দিয়ে ক‍্যাপশনটা দেখো আগে…আমার জীবনের দুই সেরা শিক্ষিকা মানে নিজের মা আর শাশুড়িমাকে একেবারে অনার দিয়েছে,বাব্বা মাম্মান তো মেডেল পেল বৌদিভাইয়ের কাছে।”
   এখনকার মেয়েরা সত‍্যি পারে,একসময় দিদি কিছু বললেই মুখ কালো করে উত্তর দিত সে আবার এই নেকু পুষু পোষ্ট করেছে এখানে। বেশ কয়েকশো লাইক আর কমেন্ট পেয়ে যাবে এই সুযোগে। আর দিদিটাও দেখে একেবারে গদগদ হয়ে উঠবে। কত যে আর দেখবে! শেষে টিচার্সডে তে ও মা আর শাশুড়িকে নিয়ে আদিখ‍্যেতা।
অনুরাধার মনে পড়ে যায় ওকে দেখতে যাবার দিনের কথা,দোষের মধ‍্যে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলো,’ জামাইবাবু আর টুবলু খুব খেতে ভালোবাসে তা তুমি রান্নাটান্না টুকটাক জানো?
টুবলুও চোখ পাকিয়েছিলো,আর দিদিও অস্বস্তিতে পড়েছিলো কে জানে কি উত্তর দেবে।
উত্তর পেয়েছিলো,”টুবলু খেতে ভালোবাসে তা আর জানবোনা,সব টাকা তো খেয়েই খরচ করে। আর আঙ্কেল ভোজনরসিক বলেই তো এমন হয়েছে। তবে আমি বেশি রান্নাটান্না জানিনা। মানে সময় হয়না করার,মাও করতে দেয়না হাত পোড়াবো বলে। ভাব ভালোবাসার বিয়ে তাই দিদি একটু হাল্কা ঠ‍্যালা মেরেছিলো মানে কিছু না পারলেও ওখানেই ছেলের মন পড়েছে তাই কিছুই করার নেই। দিদি হেসে জিজ্ঞাসা করেছিলো,” রান্না করার ইচ্ছে আছে তো,তাহলেই হবে।”…” না না আমার রান্না করতে ভালো লাগেনা,প্রতিদিনের মেনু ঠিক করা জাস্ট বোরিং। কেন ও বাড়িতে তো রান্নার লোক আছে তাহলে আবার কি?”
একটু হাসি পায় অনুরাধার সব খবরই তো জানো মা। তবুও যদি ও কখনো কামাই করে। যাক আর কথা বাড়ানো হয়নি। ফেরার সময় দিদি বলেছিলো,’ তোর জামাইবাবুর জন‍্য তো আমাকে দেখতেই হবে রান্নাঘর। আমার আর ছুটি হবেনা কোনদিন।’..’জামাইবাবু আর ছেলে দুজনেই হেসে বলেছিলো যেদিন ভালো লাগবেনা বলবে আনিয়ে নেব হোমডেলিভারী।’…দিদির কাছে বকুনি খেয়েছিলো অনুরাধা,আজকাল মেয়েদের মুখে লাগতে হয়। আমাদের পলিটাই কম কি,মুখে খই ফুটছে। ফেসবুকে যা একখানা গল্প পড়ি, তারপর বলবে আমি এত পড়াশোনা করে কি রান্নার লোক হতে যাচ্ছি আপনাদের বাড়িতে? আপনার ছেলে কি রান্না পারে? যদিও আমাদের টুবলু টুকটাক কাজ চালাতে পারে।
বাবলি বিয়ের পর এসেছিলো শ্বশুরবাড়িতে,দিদি তেমন কিছু ওকে বলতোনা। নিজের খেয়ালে থাকতেই ভালবাসতো। এই সেল্ফি তুলছে,শপিংয়ে যাচ্ছে। উইকএন্ডে মুভি দেখা বা টুকটাক বন্ধুদের সাথে বেড়িয়ে যাওয়া এইসব নিয়েই বেশ যাচ্ছিলো। সবচেয়ে ঝামেলা হত ঠিকে লোক না এলে,হাতের নখ খারাপ হয়ে যাবে বলে বাসন মাজার ধার দিয়েও যেতনা কখনো। দিদি বেচারা অভিযোগ করত একটা কাপও ধোয়না কখনও,কি করে পারে বলত এমন চোখ বন্ধ করে থাকতে! মুখে অনেক কিছু হয়ত সবসময় বলা যায়না,তবুও টুবলু বুঝেছিলো হয়ত ওরা এখন বাড়তি চাপ হয়ে গেছে মায়ের কাছে। তাই বিদেশের হাতছানিটা লুফে নিয়েছিলো,ওদেশে থাকার মজাই আলাদা,স্বাধীন জীবন কেউ কিছু ভাবার নেই। খুশিতে মেতে উঠেছিলো বাবলিও,সত‍্যি ফেসবুকে বিদেশের স্ট‍্যাটাস আপডেট করার মজাই আলাদা। মা বাবা, শ্বশুর শাশুড়ির নজরের বাইরে এক স্বাধীন জীবন তার মজাই আলাদা।
এর মধ‍্যে ওদের একটা পুচকেও হয়েছে এখানে আসার পর,তাই সিটিজেন হওয়ার ব‍্যাপারটা মোটামুটি পাকা। উইকএন্ডে লঙ ড্রাইভ,খাওয়া দাওয়া পার্টি বেশ সাজানো জীবন। তবে বাবলির সাধের ম‍্যানিকিওর করা নখ একদম গেছে,ওদেশে গিয়ে মোটামুটি জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সব নিজেকেই করতে হয়। টুবলু তো সারাদিনই অফিসে থাকে আর বাকিটা ছেলে সামলায়। এখন আর জানলায় কাপ রেখে বসে থাকা হয়না। খুব চটজলদি সিঙ্ক খালি করে ফেলতে হয় যাতে ওখানে কিছু না থাকে,শীতকালে হাত ফাটে জল ঘেঁটে তাতে বোরোলীন লাগিয়ে রেখেও কাজ সেরে ফেলতে হয়,আসলে এখানে ঠিকে লোক পাওয়া যায়না। বাথরুম সাফাই,ডাস্টিং,ওয়াশিং,ক্লিনিং, গাড়ি ধোয়া,বাজার করা সবটাই নিজেকে করতে হয়।
 টুবলু বাজার থেকে কখনো কচুর শাক এনে কতদিন খাইনি বললে না করতে পারেনা যে করতে পারবোনা। রান্না অনেক শিখে ফেলেছে,কখনো ফোনে কখনো নেটে। ছেলে সামলানো,ন‍্যাপি পাল্টানো। ওর খাবার বানানো সবটা সামলাতে সামলাতে বাবলি এখন সত‍্যিই পাকা গিন্নী। আজকাল শাশুড়িমায়ের একটা কথা খুব মনে হয়,’ তোমার শেখার ইচ্ছে আছে তো?’..যদিও তখন বিন্দাস বলে দিয়েছিলো শেখার কোন ইচ্ছেই নেই। আসলে কোন কাজ ঘাড়ে চাপলে সেটাই বোধহয় সব শিখিয়ে নেয় সুদে আসলে।
জীবনের প্রতি পদক্ষেপে জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়,শেখায় কখনো বড়রা আবার কখনো ছোটরাও। শেখার হয়ত কোন শেষ নেই,জীবন কাউকেই ছাড় দেয়না। তাই বাপের বাড়ির সুখে আদরে মেয়েরা যেমন বাবা মায়ের কাছে অনেক কিছু শেখে তেমনি শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও শেখে হয়ত জীবনের না শেখা অনেক পাঠ কখনো সুখে কখনো বা অসুখে। তাই বাবলি অনেক খুঁজে দুই মায়ের সাথে তোলা ছবিটা বের করে ক‍্যাপশনটা দিয়েই ফেললো। একটু কি বেশি তেল মারা হয়ে গেল? হোকনা,ক্ষতি কি?…সংসারে বোধহয় বুদ্ধি যস‍্য বলং তস‍্য। সকালে হাতে কফির মগটা নিয়ে ব্রেকফাস্টের ব্রেড টোষ্ট করতে করতে মোবাইলে চোখ রাখে,উরিব্বাস শাশুড়িমা,মা,মাসতুতো ননদরা এমন কি ওর মার্কামারা মাসিশাশুড়িও লাইক দিয়েছেন ছবিটাতে এমন কি টুবলুও!
মায়ের আর শাশুড়িমায়ের লাভ ইমোজিটা হ‍্যাপি টিচার্সডের সারাদিন লাভি ডাবি করে রাখলো নানান কাজের মাঝে বাবলিকে।
(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment