স্বপ্ন দেখে – সমর্পণ মজুমদার

     আমার কাছে স্বপ্নের একটা নিজস্ব ধারণা আছে। জানিনা সেটা অন‍্যদের মতের সঙ্গে মিলবে কিনা, কিন্তু আমি মনে করি স্বপ্নের এই সংজ্ঞাটা যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত। আমার কথায় স্বপ্ন হলো স্বল্পশক্তির চিন্তা। সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় আমাদের মন শক্তিপূর্ণ থাকে। সেই সময় আমরা যা চিন্তা করি সেগুলো ইচ্ছাকৃত। আমরা চাই বলেই চিন্তাগুলো মাথার মধ্যে খেলা করে। কিন্তু যখন ঘুমাই,তখন শক্তি খুব কম থাকে। সেই সময়েও কিন্তু আমাদের মাথাটা চিন্তা করতে পারে। সেগুলো অনিচ্ছাকৃত চিন্তা। সেগুলোর ওপরে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আর সেটাই হলো স্বপ্ন। চিন্তা করতে করতে ঘুম এসে যাওয়ায় হঠাৎ সেই চিন্তাটা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাওয়ার ঘটনা আমার সঙ্গেই হয়েছে। একজনের স্বপ্ন কতটা যুক্তিপূর্ণ হবে, কতটা বাস্তবসম্মত হবে সেটা নির্ভর করছে তার মন কতটা একাগ্র, তার ওপর। আমার ধারণা স্বামী বিবেকানন্দ একদমই অযৌক্তিক স্বপ্ন দেখতেন না। যোগী ব্যক্তির স্বপ্ন বাস্তবসম্মত হয়। যে ব্যাক্তির মন যতটা ধীর-স্থির-শান্ত-দৃঢ়, তাঁর স্বপ্ন তত কম উল্টোপাল্টা হয়।
                      আসল কথায় আসা যাক এইবার। সেদিন রাতে শুয়ে শুয়ে কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনতে শুনতে ঘুম এসে গিয়েছিল। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। যে গানটা চলছিল, সেটা শুনলাম জেগে। ঠিক করলাম, আজ রাতে বেশ কিছুক্ষণ ধরে গান শুনবো। আর তার পরেই আমার ফোনের মিউজিক প্লেয়ারে শুরু হল একটা গল্পপাঠ। ভূতের গল্প। সময় দেখলাম রাত দুটো। বাকি চারজন রুমমেট সবাই ঘুমোচ্ছে। মেসের চারতলায় যেহেতু আমাদের ঘর, তাই এই হেমন্তের রাতে ঠান্ডাটা মোটামুটি ভালোই অনুভূত হয়। সে কারণে সবাই আপাদবক্ষ চাদর ঢাকা দেওয়া। আমার বিছানাটা এক কোণায় হওয়ায় শোবার সময় বেশ দারুন লাগে। সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য পরিস্থিতি ! পরের দিন সকালে ওঠার তাড়াও যেহেতু ছিল না, তাই ঠিক করলাম বেশ তারিয়ে তারিয়ে মজা করে শুনব ভূতের গল্পটা। গল্প শুরু হয়ে এগোতে লাগলো। শুনতে লাগলাম আর উপভোগ করতে লাগলাম মুহূর্তটা। কি দারুন গল্প ! বেশ জমে উঠেছে রাতটা। যাকে কেন্দ্র করে এই গল্পটা, সে তার ঘরে বসে রাত্রিবেলা পড়াশোনা করছে। সামনেই কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা তার। চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পড়তে সে অভ‍্যস্ত। কিন্তু আজ তার মন বারবার বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
 মন চলে যাচ্ছে ওর পাশের বাড়ির বন্ধুর বাড়িতে দুপুরে ঘটা অদ্ভুত ব্যাপারটার দিকে। আজ সকালেই ওর ঐ বন্ধুর ঠাকুমা মারা গিয়েছেন। তাই তাদের বাড়িতেই কাটিয়েছে সে দুপুরটা। লোকসমাগম হয়েছিল অনেক। এমন সময় কেউ একজন ওর হাতে কিছুটা তুলো দিয়ে বলেছিল, মৃতব্যক্তির নাকে মুখে গুঁজে দিতে। যথারীতি তাই করে দিয়ে, বেশ কিছুক্ষণ অন‍্যদিকে মন দেবার পর হঠাৎ তার খেয়াল হয়েছিল মৃত্যুর প্রায় সাত ঘন্টা পরেও মৃতদেহের তাপমাত্রা একটুও শীতল হয়নি ! সে একজন সুস্থ মানুষের মতই উষ্ণতা অনুভব করেছিল ঐ মৃতদেহে। ততক্ষণে শ্মশান যাত্রীরা বেরিয়ে পড়েছে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি নিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে এসেছিল সে। কাউকে কিচ্ছু বলতে পারেনি আর। এতগুলো মানুষ মৃতদেহে হাত দিল, কারো কিছু মনে হলো না ? না না হয়তো সেটা তার মনের ভুল। কিন্তু না, মনের ভুল নয়, সে নিশ্চিত ! নাকি কখনো কখনো এমন হয় ? হয়তো বুঝি এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে।
অদ্ভুত ভাবে তার মনে একটা বিশ্রীভাব নেমে এলো। বহুক্ষণ পর্যন্ত কারো সঙ্গে কথাও বলতে পারেনি সে ঠিকমতো।  এখনো পড়ায় মন বসছে না। নাঃ এবার তাকে শুয়েই পড়তে হবে। শুধু শুধু সময় নষ্ট সে করার চেয়ে সকালে উঠে মন বসানো ভালো। শুয়ে চোখ বন্ধ করেও কোন লাভ হল না তার। ঘুম তো আসছেই না, উপরন্তু সকালের ঘটনাটা মনের মধ্যে গেঁথে বসে আছে। আসছে না, ঘুম আসছে না। ভয় লাগছে কি তার ? লাগছে বোধহয়। নাঃ ও সাহসী ! কিন্তু সাহসীরও ভয় লাগে কখনো কখনো। হ্যাঁ ভয় লাগছে ওর। এপাশ-ওপাশ করতে থাকল বিছানায়। এলো, অবশেষে ঘুম এলো ধীরে ধীরে। ঘুম এলো, কিন্তু চিন্তাটা রয়ে গেল মাথায়। চিন্তাটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেছে এখন। নিজের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। স্বপ্নে নিমজ্জিত হয়ে গেল সে ধীরে ধীরে। হঠাৎ সে কাকে দেখতে পেলো ? কে উনি ? রবির ঠাকুমা ! উনি যেন ওর বিছানাতে বসে ওর কাঁধে হাত রাখলেন ! গরম হাত ! ডাকলেন তাকে। সমর্পণ… সমর্পণ… সমর্পণ… !
                         “ওমাগোঃ” ! ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলাম ! অল্প হাঁপাতে লাগলাম। আমি কাকে দেখলাম ? স্বপ্নে কে ডাকলো আমায় ? আমার পাশের বাড়ির বন্ধু রবির ঠাকুমা ! উনি এই একমাস হলো মারা গেছেন। আমি তখন বাড়িতেই ছিলাম পুজোর ছুটিতে। ওনাকেই দেখলাম আমি !
                           ফোনে মিউজিক প্লেয়ারটা বন্ধ করে ঘর থেকে বেরোলাম। চোখে মুখে জল দিয়ে উঠে গেলাম ছাদে। পায়চারি করতেও ভালো লাগছিল না। ছাদের এক কোণায় রান্নাঘর। সেখানে গিয়ে বসলাম। ছাদের চিলেকোঠার ছোট ঘরটায় অভীকদা থাকে। শুনতে পেলাম সে দরজা খুলে বেরোলো। আমিও রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। নাহলে হঠাৎ কেউ রাত আড়াইটার সময় রান্নাঘরের অন্ধকারে কাউকে বসে থাকতে দেখলে চমকে যাবে। রাস পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় অভীকদা কে দেখে ভালই বোঝা গেল সে অবাক হয়েছে। অভীকদা আমার সাথে এমনিই কয়েকটা কথা বলে নীচের বাথরুম থেকে ঘুরে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “ক্ষুদা লাগসে তুমার ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “রান্নাঘরে ছিলাম বলে বলছো ?” ও ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। আমি “না না” বলে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললাম !!
_____

 


FavoriteLoading Add to library
Up next
মানব বোমা – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... উগ্রপন্থী কার্যকলাপে সাহায্য করার জন্য আজ দুদিন হলো আমি লক আপে বন্দী আছি । নানান প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি । তবে এখনো আমার গায় হাত তো...
সত্যজিতের চিড়িয়াখানা-প্রচুর আলোচনা ও সামান্য সমালো... একটা সিনেমা তৈরির পেছনে যে ইন্টারেস্টিং গল্পগুলো থাকে তা দিয়েই হয়তো আরেকটা সিনেমা বানানো হয়ে যেতে পারে। এরকম বহু ছবি আছে যা তৈরি হতে হাজারো বাধা এসেছি...
অপরাহ্নের আলো - অদিতি ঘোষ   আজ সকাল সকাল স্নান সেরে ঠাকুরঘরে ঢুকেছেন যূথী।কৈশোর থেকেই দোল-পূর্ণিমার এই দিনটায় মধুর এক আবেশে ভরে থাকে যূথীর মন।ঠাকুরদার প্...
শেষ থেকে শুরু -পায়েল সেন    সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। তাই সুজয় চললো তার ঘরের সমস্ত জানলা বন্ধ করতে। ভিজে গিয়েছিল প্রায়। ঘর অন্ধকার করে এসে একমনে বসেছিলো ...
ই ফর্ অয়লার – দিব্যেন্দু গাঙ্গুলী... এবারের আলোচনা শুরু করছি ‘e ’ সংখ্যাটি দিয়ে। পাইয়ের মত e ও একটি অমূলদ সংখ্যা। অর্থাৎ দশমিকের পর সীমিত সংখ্যা দ্বারা একে প্রকাশ করা যায় না এমন সংখ্যা। ক...
বঙ্গদেশ – বৈশাখী চক্কোত্তি... বঙ্গ দেশের ভান্ডার, বিভিন্ন রতনের সম্ভার খুলে দেখো পুস্তিকা, ইতিহাস সাক্ষী তার। শাসক হয় শাসিত, পরাধীনতার ফাঁদে জড়িত, যুগে যুগে আছে প্রতারক, তাদের ক...
আষাঢ়ে ভূত – শাশ্বতী সেনগুপ্ত...  আকাশ এখন অনেক বদলে গেছে। বেশি সময়-টময় নেয় না আর। প্রথমেই দুহাতে এক রাশ কালো মেঘ টেনে আনে। তারপর নিজের বুকটাকে ঘন কালো মেঘে ছেয়ে দেয়। ঝটাঝট কয়েকটা ব...
আলতুফালতু   ছন্দ নিয়ে ধন্দ থাকলে মন্দ বলে লোকে,  কেউ কেউ নিজেই লেখে কেউ বা স্রেফ টোকে. জমলে শুধু ক্ষীর কেনো বরফও ও তো জমে, জমজমাটি দৃশ্য দেখলে চোখের নজর কমে. ঠো...
পণ্যগ্রাফি -কৌশিক প্রামাণিক বোনটি তো আমার সেদিনই কেঁদেছিল যেদিন ও প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিল, লোভী চোখের দৃষ্টিগুলোতে চিন্হিত হলো সে মেয়ে তখন জন্মেই তাকে শুনত...
লাইটহাউস – সৈকত মন্ডল... আরও একটা বছর, আরও কয়েকটা মাইলস্টোন, তাতে লেখা স্বপ্নপূরনের দ্বুরত্ব, আরও কিছুটা রাস্তা, অন্ধকার, তবে কেন জানিনা ঠিক নিসঙ্গ নয়, অচেনা, অজানা কেও...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment