হারানো সুর – সুস্মিতা দত্তরায়

চোখের জল বাঁধ ভাঙলো ইরার। চোখ ছাপিয়ে দুই গাল বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা। দুই হাতে তা মুছে আবার ফিরে তাকাল ওই দোতলা বাড়ীটার দিকে। তারপর ধীর পায়ে উঠোনটা পেরিয়ে গিয়ে গেলো বড় গেটটার দিকে। গেটের বাইরে অপেক্ষমান তাদের গাড়ী। গাড়ীতে উঠতে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল বাড়ীটার দিকে। হঠাৎ করে বহু বছরের পুরনো এক মুহূর্ত মনে পড়ে গেলো ইরার। চোখের সামনে ভেসে উঠলো বিয়ের পরের দিনের বিদায় বেলার ক্ষণ। গাড়ীতে উঠবার সময় এভাবেই ফিরে তাকিয়েছিল ইরা। দেখেছিলো মায়ের কান্না ভেজা করুণ মুখখানি। এই মুহূর্তে মনে হল সারা বাড়ীটাই যেন করুণ চোখে চেয়ে আছে তার দিকে, ঠিক মায়ের মতো। সেদিনের মতো আবারও বুকের ভেতর থেকে কান্না উথলে উঠলো ইরার। সম্বিত ফিরল গাড়ির ভেতর থেকে প্রতুলের ডাকে। ভিতরে গিয়ে বসতেই ড্রাইভার গাড়ীতে স্টার্ট দিলো। জানলা দিয়ে যতক্ষণ দেখা যায় ইরা তাকিয়ে থাকলো পেছনে ফেলে আসা ওই বাড়ীটার দিকে। আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেলো সব। মিলিয়ে গেলো গেটের উপর অনেক বড় করে লেখা বাড়ীটার নামটাও- “বেলাশেষের নীর”। মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এলো ইরা।

        বাড়ীর কাছাকাছি আসতেই ইরার দাদা ইমনের ফোন -“মা কে তাহলে শেষমেষ রেখেই এলি বৃদ্ধাশ্রমে?” তির্যক প্রশ্নের উত্তরে ইরা শুধু আস্তে করে একটা হ্যাঁ সূচক শব্দ করলো। উত্তরে আবার ইমনের  কটাক্ষ -“আর কটা দিনই বা বাঁচত মা? এই কটা দিন আর সহ্য হল না?” ফোনটা কেটে দিয়ে  আবার ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললো ইরা। সে যে আর পারছিলো না, পারছিলো না দেখতে চোখের সামনে  আস্তে আস্তে মায়ের ক্ষয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া ।
ইরার বিয়ের আগে থেকেই ওর দাদা ইমন কানাডাতে চাকরি রত। ওর বিয়ের সময় এসেছিলো একবার, তাও বছর  আঠেরো হয়ে গেলো। তার দুই বছর পর হঠাৎ একদিন সকালে ইরার বাবার হার্ট অ্যাটাক হল। নিমেষে সব শেষ, হসপিটাল নিয়ে  যাবার সুযোগটুকুও পাওয়া গেলো না। বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়েও এল না ইমন। বলল, কাজের চাপে ছুটি পাওয়া গেলো না। ইরা তখন আসন্ন সন্তানসম্ভবা । মায়ের পাশে থেকে মাকে সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না ইরার। সৎকার থেকে  শ্রাদ্ধশান্তি, সব প্রতুল  সামলাল  ইরার দুজন খুড়তুতো ভাই কে সঙ্গে নিয়ে।  সেই থেকে ইরার মা বাসন্তী দেবী একাই থাকতেন  বাড়ীতে। মাস দুই পর যখন ইরার কোলে রাতুল এলো, ইরা মায়ের কাছে গিয়ে তিনমাস ছিল।

তারপর ইরা নিজের বাড়ীতে চলে এলে বাসন্তী দেবী আবার একা। তার এই একাকীত্বের সংসার আপাত দৃষ্টিতে ঠিকঠাকই চলছিলো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বাসন্তী দেবীর ক্ষয়ে যাওয়াটা বুঝতে পারেনি  কেউই। হঠাৎ একদিন সাতসকালে ইরার কাছে বাসন্তী দেবীর কাজের মেয়ে নন্দার ফোন -“দিদি, তাড়াতাড়ি এসো, মাসিমা অজ্ঞান হয়ে গেছে”। ছেলেকে কোলে তুলে ইরা ছুটল মায়ের বাড়ী, সাথে প্রতুলও। ওদের গাড়ীতেই হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হল। ডাক্তার দেখে বললেন যে একটা  ছোটোখাটো স্ট্রোক হয়ে গেছে, তবে ভয়ের কিছু নেই আপাতত। কিন্তু ভবিষ্যতে বড়সড় একটা কিছু হবার সম্ভাবনা প্রবল, তাই বাড়ীতে একা না রাখাই ভালো। সেই থেকে বাসন্তী দেবী মেয়ের কাছেই থাকেন। ছেলে ইমন মাসান্তে একবার ফোনে খবর নিয়েই নিজের কর্তব্য পালন করে। এরমধ্যে ভালবেসে একটি পাঞ্জাবী মেয়ে কে বিয়েও করেছে সে । এই আঠেরো বছরে একবারের জন্যও আসেনি মা কে দেখতে, কোন টাকা পয়সাও পাঠায় না, কোনোদিন  পাঠায়ও নি। স্বামীর পেনশন টা থাকাতে বাসন্তী দেবী আর্থিক দিক  দিয়ে মোটামুটি স্বনির্ভর।

ইরার বাড়ীতে ছোট্ট রাতুল কে নিয়ে দিন ভালই কাটছিল তার। তখন রাতুল সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ইরা আর প্রতুল বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই ছুটি হয়ে যেতো রাতুলের। স্কুল বাস বাড়ী দিয়ে  যেতো  তাকে। তার পর সারাদিন ধরে দিদা আর নাতির কতো খেলা, কতো গল্প। ইরা বাড়ী ফিরে হোমওয়ার্ক গুলো করিয়ে দিতো। তারপর আবার খাওয়া, শোয়া, গান শুনতে শুনতে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দেওয়া, সবই ছিলো রাতুলের দিদার সাথেই।

এরপর আস্তে আস্তে বড় হল রাতুল। পড়ার চাপ বাড়ল, বাড়ল স্কুলের সময়সীমাও। শুরু হল বাড়ী ফিরে কিছু একটু মুখে দিয়েই আবার টিউশন ছোটা। ছোট্ট নাতির বৃত্ত, দিদার বৃত্ত কে ছাপিয়ে বেরিয়ে গেলো। তার বন্ধু বলয় এখন আলাদা, আলাদা তাদের সাথে আলোচনার বিষয়বস্তুও। দিদার রূপকথার জগৎ ছেড়ে রাতুলের হাতের মুঠোয় এখন নেট দুনিয়া। পড়াশোনা, স্কুল, বন্ধু, টিউশন , কম্পিউটার, মোবাইল – এই সবের কাছে হার মানল দিদার আদর, নিজে না খেয়ে, খাবার সাজিয়ে নাতির জন্য অপেক্ষা করা, রাতুল স্নান করে বেরোলে জল ঝরতে থাকা মাথাটা নিজের আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দেওয়া, খাবার খেয়ে মুখ ধুয়ে এলে আঁচলের খুঁট টা মুখ মোছার জন্য এগিয়ে দেওয়া,-আরও অনেক কিছু। প্রতুলের ফিরতে আগাগোড়াই রাত হয়, এবার ইরারও অফিস স্থান বদল করলো বেশ কিছুটা দূরে। ফলে ওরও ফিরতে বেশ রাত হতে লাগলো । বাসন্তী দেবীর জীবনে আবার ঘনিয়ে এলো ভয়ঙ্কর একাকীত্ব।সকালবেলায় সবাই বেরিয়ে যাবার পর থেকে রাত অব্দি চার দেয়ালের মাঝে শুধুই নিজেকে খোঁজা। ইরা প্রস্তাব দিলো সারাদিনের জন্য একজন আয়া রাখার, কিন্তু বাধ সাধলেন বাসন্তী দেবী নিজেই। তিনি তো আর চলতশক্তিহীন নন। সারাদিন আয়া কিই বা করবে। অগত্যা ইরা সেই প্রচেষ্টা থেকে ক্ষান্ত হলো। এইভাবে দিন কাটছিলো, আর ইরা প্রত্যক্ষ করছিলো যেন মা ক্ষয়ে যাচ্ছে, নিভে যাচ্ছে আস্তে আস্তে,- যে মানুষ কথার মাঝে মাঝেই গুনগুনিয়ে গান গেয়ে উঠতো, তার গলায় সুর হারিয়ে গেছে, সবসময় মনমরা।

সেদিন ইরা অফিসে টিফিন টাইমের পর সবেমাত্র আবার কাজে বসেছে, হঠাৎ রাতুলের ফোন,-“বাড়ীর দরজা ভেজানো, গ্ৰীল খোলা, কিন্তু ভেতরে দিদা নেই।” তড়িঘড়ি করে বাড়ী ছুটলো ইরা। মাকে একটা ফোন দিয়েছিল, সেটাও বেজে গেল দুইবার। তিনবারের বার রাতুল ফোন টা তুললো, বাড়ীতেই রয়েছে সেটা। প্রতুল শহরে নেই, ব্যাঙ্গালোর গেছে অফিসের কাজে। তাই ওকে আর ঘটনাটা তখনই জানালো না ইরা। বাড়ী ফিরে, ও আর রাতুল মিলে চারিদিক তন্নতন্ন করে খুঁজলো, আশেপাশের সবাইকে জিজ্ঞাসা করলো, কিন্তু বাসন্তী দেবীর কোনো হদিস পেলো না। হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগলো ইরা, কোথায় যাবে, কি করবে কিচ্ছু ভেবে পেলো না।  শেষে রাতুলই বললো থানায় যাবার কথা, রিপোর্ট করতে হবে। বাড়ীর ড্রাইভার ছুটিতে। অগত্যা স্থবিরের মতো রিকশায় বসে রাতুলের সাথে থানার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো ইরা। থানার ঠিক আগের মোড় টা ঘুরতেই ইরার ফোনে রিং বেজে উঠলো। মায়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে রাতুল দ্যাখে, বাড়ীতে যে ছেলেটা কেবল টিভির লাইন দিয়েছে, সেই ছেলেটার নম্বর। তুলতেই অপর প্রান্তে আওয়াজ ভেসে এলো,-“হ্যালো, মাসিমা শীতলা মন্দিরের পেছনে রেললাইনের ধারে, একদম লাইন ঘেঁষে একটা পাথরের উপর বসেছিলেন। ভাগ্যিস আমি ঐ দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, তাই দেখতে পেলাম। নাহলে একটা অঘটন ঘটতে আর বাকি ছিলো না । আমি লাইন থেকে সরিয়ে মন্দিরে বসিয়েছি, আপনারা তাড়াতাড়ি আসুন।”

সত্বর রিক্সা ঘুরিয়ে মন্দিরের দিকে চললো ইরা। মন্দিরে ঢুকে মাকে দেখতে পেয়েই ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। মেয়ের কান্না ভিজিয়ে দিলো মায়ের শাড়ি। কিন্তু বাসন্তী দেবী দাঁড়িয়ে রইলেন পাথরের মতো, যেন চলতশক্তিহীন। বিহ্বলতা কিছুটা কাটতেই ইরা লক্ষ্য করলো মায়ের সারা শরীর কাঁপছে, ঠোঁট দুটো বেঁকে যাচ্ছে, আর চোখ দিয়ে অবিরাম জল ঝরছে। ভয়ে ইরার হাত পা ঠান্ডা হবার অবস্থা। তাড়াতাড়ি একটা রিক্সা ডেকে মন্দিরের একদম কাছের নার্সিংহোম টায় নিয়ে গিয়ে ভর্তি করলো মা কে। ডাক্তার সব দেখে, পরীক্ষা করে ইরা কে একটু ভর্ৎসনাই করলেন এমন বয়স্কা একজন মানুষ কে সারাদিন বাড়ীতে একা রেখে দেওয়ার জন্য। কিছু ওষুধ দিয়ে, কয়েকটা টেস্ট করাতে বললেন। কিন্তু সাথে এটাও বললেন যে একাকীত্বের কারণেই এইসব ঘটেছে, তাই সেই সমস্যা দূর না হলে কোনো ওষুধই কিছু করতে পারবে না।

মা কে নিয়ে বাড়ী ফিরলো ইরা। প্রতুলকে ফোনে সব জানালো। অফিসে ফোন করে এক সপ্তাহের ছুটি নিলো। বাসন্তী দেবী কোনো কথাই বলছেন না, কথার উত্তরও দিচ্ছেন না কোনো। চুপচাপ শুয়ে আছেন আর চোখের দুই কোন বেয়ে অবিরাম জল ঝরে যাচ্ছে। কি করবে ইরা? চাকরীটা ছেড়ে দেবে?
হঠাৎ ইরার মনে পড়লো দীপ্তির কথা, ওর ছোটবেলার বন্ধু। কিছুদিন আগে দেখা হয়েছিলো মেট্রো তে। দুই বন্ধুর চোখাচোখি হতেই শুধু কয়েক মুহূর্ত, আর সব স্মৃতি একসাথে ঝাঁপিয়ে চলে এলো মনে। স্কুলের দিনগুলো, একসাথে বাড়ী ফেরা, পরস্পরের বাড়ীতে যাতায়াত, একসাথে খাওয়া, সব মনে পড়ে গেলো দুজনেরই। তারপর দুজন পুরোনো বন্ধুর অফুরন্ত কথার মাঝ দিয়ে এগিয়ে চলল মেট্রো। একসময় যে যার গন্তব্যে নেমে গিয়েছিলো, কিন্তু ফোন নম্বর আদানপ্রদানের মাধ্যমে যোগাযোগটা অক্ষুন্ন রইলো। দীপ্তির কাছেই ইরা শুনেছিল এই “বেলাশেষের নীড় ” এর কথা।

দীপ্তির বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে ওর মা ওখানেই থাকে। দীপ্তিদের একান্নবর্তী পরিবার, শ্বশুর, শাশুড়ী, ভাসুর, জা, তাদের বাচ্চারা সবাই রয়েছে। এর মাঝে মা কে এনে রাখবে কোথায়, তাই এই বন্দোবস্ত। ইরা দীপ্তির মুখেই শুনেছিল যে ওখানকার ব্যাবস্থা খুব আধুনিক, অনেকটা বিদেশের মতো। নিজস্ব ডাক্তার, নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট, ডায়াটেসিয়ান সব আছে সব সময়ের জন্য। প্রত্যেকের আলাদা করে খেয়াল রাখা হয়। খাবারের ক্ষেত্রেও তাই, সবার শরীর স্বাস্থ্য বুঝে সেই অনুসারে পছন্দসই খাবার দেওয়া হয়। খরচও সেই অনুসারে একটু বেশি, কিন্তু এতো সুবিধা এবং আরামের দিক দিয়ে বিচার করলে তা মোটেও অবাস্তব নয়। রাত্রে প্রতুল এলে ইরা প্রস্তাবটা আলোচনা করলো ওর সাথে। তারপর প্রতুলও সহমত হলে পরের দিন ফোন করলো দীপ্তি কে। সব খবরাখবর নেওয়া হলে একদিন গেল ওরা ওই বৃদ্ধাশ্রমে দীপ্তি কে সাথে নিয়েই। ইরা বহুদিন পরে দেখলো দীপ্তির মাকে।

ছেলেবেলার চেনা চেহারার সাথে বয়সের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়া এই চেহারার অনেকটাই অমিল, কিন্তু চেহারায় বেশ একটা প্রশান্তির ছায়া। কথাবার্তার মধ্যেও সেই আভাসই পেলো ইরা, যেটা ওর নিজের মায়ের মধ্যে আজকাল খুঁজে পাওয়া যায় না। দীপ্তির মা তো এই বৃদ্ধাশ্রমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সব দেখেশুনে ইরা আর প্রতুল প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললো বাসন্তী দেবী কে ওখানে রাখার।
অনেক সাহস করে রাতে ইরা মাকে কথাটা বললো। সাথে ওখানকার সুযোগ সুবিধা, দীপ্তির মায়ের কথা, সব বললো। বাসন্তী দেবী ভাবলেশহীন মুখে শুধু চেয়ে রইলেন ইরার দিকে। মায়ের অসহায় নির্বিকার মুখটার দিকে চেয়ে হঠাৎ খুব কান্না পেলো ইরার। মাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদলো, তারপর জিজ্ঞাসা করলো,” মা, থাকবে তুমি ওখানে? সবার সাথে? আর তোমার একা লাগবে না মা”। বাসন্তী দেবী নিরুত্তর, শুধু চোখের দুই কোন বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ইরা আর কিছু বললো না। পরেরদিন ” বেলাশেষের নীড় ” এ ফোন করে সব ব্যবস্থা, দিনক্ষণ পাকা করে ফেললো।

সেদিন ১৪ই আষাঢ়, বাসন্তী দেবীর জন্মদিন। সকাল থেকেই ব্যাস্ত ইরা। একদিকে পায়েস বানাচ্ছে, অন্যদিকে মায়ের পছন্দের সব রান্না করছে নিজে হাতে। মা কে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার প্রায় একমাস হয়ে এলো। আশ্রমের কর্তৃপক্ষ প্রতিটি আবাসিকের প্রতি নিতান্তই যত্নবান, আবাসিকরাও সবাই খুব বন্ধুভাবাপন্ন। বাসন্তীদেবীর চিকিৎসার জন্য একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রাখা হয়েছে । সেই ডাক্তার মহিলা রোজ এসে অনেকক্ষন গল্প করেন, মন ভালো করার নানা উপায় বলেন আর প্রয়োজনমতো ওষুধ দিয়ে যান ।  বিকেলে গল্প, গানের আড্ডা বসে। আবাসিক বৃদ্ধ- বৃদ্ধারা নিজেদের ফেলে আসা স্মৃতি রোমন্থন করেন, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনীদের সাথে কাটানো সুখস্মৃতির গল্প শোনান, আরো কতো কি হয়। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত নেমে আসে, ডিনারের সময় হয়ে যায়। তারপর খাওয়া-দাওয়া সেরে যে যার ঘরে চলে যায়। রাত্রে দুজন কেয়ারটেকার পালা করে সব আবাসিকদের খেয়াল রাখে, কারো কোনো অসুবিধা হলে বিছানাটা পাশের বেল বাজালেই হাজির হয়ে যায়।

দিদার জন্মদিনে রাতুল বরাবরই একটা কেক অর্ডার করে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পায়েস, কেক, খাবার সব গুছিয়ে নিয়ে ইরা তৈরি হয়ে নিলো। প্রতুলও ছুটি নিয়েছে। তিনজনে মিলে চললো মায়ের কাছে। বাসন্তী দেবীকে রেখে আসার পর থেকেই ইরা সপ্তাহে অন্ততঃ দুদিন মায়ের কাছে যায়, কিন্তু মা কে দেখে ওর ভালো লাগে না। মায়ের সেই মনমরা ভাব টা এখনও সেরকমই আছে। কথাবার্তা সবই বলেন বাসন্তী দেবী, কিন্তু সবকিছুই মনে হয় প্রাণহীন, সবের মাঝেই একটা ছাড়াছাড়া ভাব। এখানে এসে ভালো লাগছে, না খারাপ, কিছুই বোঝা যায় না। কি আর করা যায়। রাতে ফিরে এসে ইরা এইসবই ভাবে, মাঝে মাঝে ওর খুব কান্না পায়। সবার অলক্ষ্যে একটু কেঁদে নেয়, মনটা হালকা হয়।

সেদিন গাড়ীটা বৃদ্ধাশ্রমের কাছাকাছি আসতেই খুব আনন্দ হলো ইরার। মাকে রেখে আসার পর এই প্রথমবার ওরা তিনজন একসাথে যাচ্ছে। গেটের সামনে আসতেই দারোয়ান খুলে দিলো গেটটা। গাড়ীটা ভিতরে ঢুকতেই ওরা শুনতে পেল মাইকের আওয়াজ, খুব সুন্দর করে রবীন্দ্রসংগীত গাইছে কেউ। একটু খেয়াল করে শুনতেই ইরার হৃদপিন্ড আনন্দে নেচে উঠলো, -এতো মায়ের গলা! গাড়ী থেকে নেমে ইরা ছুটলো আশ্রমের হলঘরটার দিকে। গিয়ে থমকে গেলো। হলের ঠিক মাঝখানে একটা চেয়ারে বসে আছেন বাসন্তী দেবী। সোনালী পাড়ের সাদা শাড়ী আর ফুলের মালায় সজ্জিতা মাকে দেখে ইরার মনে হলো স্বর্গের কোনো দেবী বসে রয়েছেন ঘর আলো করে। চারদিকে ঘিরে রয়েছেন তাঁর সাথীরা। বাসন্তী দেবী চোখ বন্ধ করে ধীর লয়ে গেয়ে চলেছেন তাঁর প্রিয়  রবীন্দ্রসংগীত –”আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে”।

চোখের জল ঝাপসা করে দিলো ইরার দৃষ্টি। প্রায় এক যুগ পর মায়ের গলায় গান শুনলো ইরা। রাতুলের ছোট বেলায় ওকে গান শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন বাসন্তী দেবী। নিজের যৌবনকালে, ইরা-ইমনের ছোটবেলায় পাড়ার জলসায় অনেকবার গান গেয়েছেন তিনি। তাছাড়া ঘরে সারাদিন মায়ের গান শুনতে শুনতেই বড় হয়েছে ওরা।
হলের দরজার কোনায় দাঁড়িয়ে মায়ের গান শুনলো ইরা। বার্ধক্য হার মেনেছে মায়ের কণ্ঠের কাছে, কত সাবলীল এখনো গানের প্রতিটি ঢেউ। এতদিনের অনভ্যাসেও সুরের কোনো ছন্দপতন নেই। গান শেষ হতেই হলে হাততালির বন্যা বয়ে গেল, অনুরোধ আসতে লাগলো আরো গানের। নিজেকে আর সামলাতে পারলো না ইরা। ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চোখের জলেই কথোপকথন চলল মা-মেয়ের। ইতিমধ্যে রাতুল আর প্রতুলও এসে দাঁড়িয়েছে বাসন্তী দেবীর পাশে। অনেকদিন পর কানের কাছে মায়ের সেই পরিচিত কন্ঠ শুনলো ইরা- “এখানে বেশ ভালো আছি রে। এরা সবাই খুবই ভালো। আমার আর কোনো কষ্ট নেই। শুধু মাঝে মাঝে তোদের মুখগুলো খুব দেখতে ইচ্ছে করে।”

মায়ের সামনে হলের মেঝেতে হাঁটুগেড়ে বসলো ইরা। মায়ের হাতে হাত রেখে বললো,-“আসবো মা, তোমার কাছে খুব ঘন ঘন আসবো। শুধু তুমি ভালো থাকো মা। আমি যে আর কিছু চাই না।” মেয়ের চোখের জল মুছিয়ে দিলেন বাসন্তী দেবী। একহাত দিয়ে ইরা আর অন্য হাত দিয়ে রাতুলকে জড়িয়ে ধরে বললেন,-“ভালো থাকবো, আর তোরাও ভালো থাকিস।”
সেদিন আশ্রমে খুব মজা করলো ওরা। সবাই মিলে প্রচুর আনন্দ করে কেক কাটা হলো, খাওয়া দাওয়া হলো। সবাই বাসন্তী দেবী কে বললো,-“ভাগ্য করে মেয়ে পেয়েছো দিদি। এর যে তুলনা হয় না।”
বাড়ী ফেরার সময় নিজেকে খুব হালকা লাগছিলো ইরার। বাইরে গুমোট গরম, কিন্তু ইরার মনে হলো ভেতরে ভেতরে ঠান্ডা হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে সে। হঠাৎ কি মনে হতেই হাতে ধরা ফোনে একটা নম্বর মেশালো ইরা । ওপ্রান্তের সাড়া পেতেই শুধু বললো,-” দাদা, মা ওখানে খুব ভালো আছে রে। রাখছি।”
কোনো প্রত্যুত্তরের সুযোগ না দিয়েই ফোন টা কেটে দিলো ইরা, পাশে বসা রাতুলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। তারপর ছেলেকে কাছে টেনে মাথায় একটা চুমু খেলো। অনেকদিন পর ইরাকে এইরকম খুশি দেখলো রাতুল। মাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের বুকে মাথা রাখলো সে। দূরে পশ্চিম আকাশের কোণে জমে থাকা কালো মেঘটা হঠাৎ করে একটু সরে গেলো, আর অস্তগামী সূর্যের রক্তিম ছটায় ভরে উঠলো সারা আকাশ।

_____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment