১৬-১-১৯-১৯-২৩-১৫-১৮-৪

– মনীষা বসু

    ।। ১।।

য়ার পকেটে পড়ে প্লেনে জোর ঝাঁকুনি লাগতেই ল্যাপটপ থেকে চোখ ওঠালেন সূর্য। মানুষ যেমন ঘুম থেকে উঠে চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে চায়, সে কোথায় আছে, সূর্যের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক একই ঘটলো। এক ঝাঁকুনিতে মনঃসংযোগ নষ্ট হলো তাঁর। তাই তাঁর ঠোঁটের কোণে ঈষৎ বিরক্তিও প্রকাশ পেলো। তিনি চশমাটা খুলে সিটের ওপর হেলান দিয়ে বসলেন।
বাইরে থেকে তাঁকে খুব নিশ্চিন্ত মনে হলেও তাঁর মনের ভেতরে বইছিলো চিন্তার ঝড়। প্লেন চলছে কলকাতা থেকে চেন্নাই এয়ারপোর্টের দিকে। সূর্য চোখ বুজে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন নিজের বক্তব্যকে। কোন পয়েন্টকে বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলবেন, কিভাবে তিনি এই অসাধ্যসাধন করেছেন তার সরল ব্যাখ্যা দিতে হবে শ্রোতাদের।

চেন্নাই-এ ‘আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলন’-এ আমন্ত্রন পাওয়াটা সূর্যের কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। সূর্য জানেন, এটা তাঁর আন্তর্জাতিক ময়দানে নিজের আবিষ্কার তুলে ধরার সেরা সুযোগ। এটা তিনি কোনোভাবেই হারাতে চান না। তাঁর গবেষণাটা মূলত সংখ্যার কার্যকারিতা নিয়ে। মানুষের জীবনে কোনো কার্যকর পদার্থের শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে সংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। মোবাইল থেকে শুরু করে গাড়ি, প্লেন, রেল, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, এটিএম ছাড়াও আমাদের ব্যবহার্য অনেক জিনিসের আইডেন্টিফিকেশন তৈরী হয় সংখ্যা দিয়ে। শুনলে অবাক হতে হয়, পৃথিবীর যত কার্যকর পদার্থ আছে ৬৫ শতাংশের উপরের আইডেন্টিফিকেশন তৈরী হয় সংখ্যা দিয়ে। বলতে গেলে আমরা সংখ্যা দিয়ে ঘেরা। সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন মানুষ নিজেকে চিনবে সংখ্যা দিয়ে।

সূর্যের গবেষণায় এই ব্যাপারটার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী। প্রত্যেকটি কার্যকর পদার্থ সূর্যের তৈরী সার্ভারে যদি তার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা থাকে, তাহলে যেকোনো সময় তার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর সার্ভারে লিখে সার্চ দিলে সেই জিনিসটির সমস্ত ডেটা সার্ভারটি দিয়ে দেবে। যেমন, সেটি কোথায় আছে, কি অবস্থায় আছে, তার সমস্ত তথ্য দিয়ে দেবে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই সার্ভারটির মেমরি ক্যাপাসিটি অসীম এবং সেটা কত, তা সূর্য নিজেও বোধ হয় জানেন না। সূর্য তিন বছর ধরে প্রতিদিন ২০০০ গিগাবাইট মেমরি সার্ভারে ভরছেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত এর কোনো শেষ পাওয়া যায়নি।
সূর্য জানেন, এই আবিষ্কার জনসমক্ষে এলে এই পৃথিবীর কোনো মূল্যবান জিনিস হারাবে না, খোঁজ পাওয়া পাওয়া যাবে চুরি হয়ে যাওয়া জিনিসেরও। দুর্গম এলাকায় বিমান বা জাহাজের নিমেষে খোঁজ পাওয়া যাবে।কোনো মানুষ বেঘোরে আর প্রাণ হারাবে না, হারাবে না কোটি কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তিও।
প্লেন ল্যান্ডিং করছে, সিট বেল্ট বেঁধে রেডি হয়ে বসলেন সূর্য। চেন্নাই এয়ারপোর্টে নেমে বিজ্ঞান সম্মেলন থেকে পাঠানো গাড়িতে উঠে বসলেন। মসৃণ রাস্তায় নির্দিষ্ট স্পিড রেখে এগিয়ে যাচ্ছে গাড়িটা। সূর্যের হৃৎকম্পন ধীরে ধীরে বাড়ছে। উত্তেজনায় নয়, স্বপ্ন পূরণের আনন্দে।

।। ২।।

  ক্যাপ্টেন আমেরিকার গায়ে গুলিটা লাগতে পারতো আরেকটু হলে, কিন্তু অসম্ভব দক্ষতায় শেষ মুহূর্তে লাফ দিয়ে নিজেকে বাঁচালেন। একাই চার-চারটে শত্রুর ডিফেন্স করলেন। তারপর জয়ী হয়ে এগোলেন নতুন মিশনের দিকে।
“অ্যাই, আজকের খবরের কাগজটা পড়েছিস?” বলেই নিশা সেন্টার টেবিলে খবরের কাগজটা রাখলো।
কম্পিউটার গেমসগুলো একজিট করতে করতে রাহুল বললো, “তুই আসার ৮ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড আগে সেটা পড়া হয়ে গেছে। আর এটাও অনুমান করতে পারছি, তোর উত্তেজনার কারণ কি।”
“বলতো, কারণটা কি?” চোখে অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে প্রশ্ন করলেন নিশা।
রাহুল শুধু চারটে শব্দবন্ধ বললো, “সার্কুলার রোড, সূর্য রায়চৌধুরী, চেন্নাইতে গায়েব।”
নিশা হতাশ ভঙ্গিতে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন।
“আরে! চেন্নাই তে নয়, চেন্নাই থেকে ফেরার পথে। এসব ছাইপাঁশ গেমটেম না খেলে কেসটা নিয়ে ভাব।”
“কোন গেমকে ছাইপাঁশ বলছিস? জানিস অ্যাভেঞ্জারস্ গেম খেললে বুদ্ধি বাড়ে। জানিস কিছু তুই?”
“আরে শোন না, আমি বলছি, এর মতো ঘোরপ্যাঁচ কেস দ্বিতীয় পাবি না। এই প্রথম আমার মনে হচ্ছে, আমরা দুজনে মিলেও এই কেসটা উদ্ধার করতে পারবো না।”

রাহুল কম্পিউটারের উপরে খালি চকোলেটের প্যাকেট টা দুমড়ে স্ট্রাইকারের ঘুঁটি মারার মতো করে ডাস্টবিনের বাস্কেটে নিখুঁত থ্রো করে বলল, “চ্যালেঞ্জ রাহুল বিশ্বাসকে? রাহুল কখনও পরাজিত হয়নি। আমার সাফল্যের হার ৯৮ শতাংশ।”
সত্যিই অহঙ্কার করার মতো ব্যাপার আছে রাহুলের মধ্যে, এটা নিশা ভালই জানেন। নিশা যে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের এত বড়ো দায়িত্বশীল পদে আছেন, তার একটা বড়ো কারণ, ওঁর পিছনে রয়েছে রাহুল নামের ছেলেটার মাথা। নিশা নিজেই একজন বড়ো ভক্ত রাহুলের মাথার। নিজের ছোটো ভাইয়ের মতোই মনে করে। যখনই নিশা কোনও কেস নিয়ে বিপদে পড়েছে, রাহুল তখনই অকৃপণ হাতে সাহায্য করেছে তাকে। অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও কুড়ি বছরের এই ভাইয়ের ওপর নিশাও ভীষণ ভরসা করে। তাই বড়মাসির এই ছেলেটাকে নিশা নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।

“কিরে, কি হল নিশা? চুপ করে গেলি যে? তোর বাংলার পাঁচের মতো মুখ দেখে মনে হচ্ছে সদ্য বড়সাহেবের কাছ থেকে হেনস্থা হয়ে ফিরেছিস!”
এবার বলল নিশা, “না রে, তা নয়, তবে একজন তরুণ বিজ্ঞানী এইভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে  যাবেন, তাও আবার প্লেনের ভিতর থেকে! তুই কি জানিস, ওঁর আবিষ্কার নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে এখনই সাড়া পড়ে গিয়েছে। এই সময় যদি ওঁকে না পাওয়া যায়….”
কথাটা শেষ করতে পারলেন না নিশা, তার আগেই রাহুল বলে উঠল, “প্লেনের ভেতর থেকে মানে?”
“মানে, এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি সূর্যকে গেট পাস করতে দেখেনি।”
এবার একটু চিন্তিত দেখালো রাহুলকে, “কেসটা একটু গোড়া থেকে বল তো।”
“তা হলে শোন, সূর্য রায়চৌধুরী চেন্নাইতে গিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে, নিজের আবিষ্কারকে প্রচারের উদ্দেশ্যে।”
“কী আবিষ্কার?” নিশাকে মাঝপথে থামিয়ে রাহুল প্রশ্ন করলেন।

কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করে নিশা রাহুলের হাতে দিল। “এই নে, এটা সূর্যের রিসার্চ পেপারস, সব কিছু ডিটেলসে্ পাবি।”
সূর্য চেন্নাইতে পৌঁছন ১০ ই ফেব্রুয়ারী, প্রথম বক্তৃতা দেন ১২ ই ফেব্রুয়ারী, আর দ্বিতীয়টি ১৫ ই ফেব্রুয়ারী, এবং শেষটি ১৯ শে ফেব্রুয়ারী। আর ওই দিনই বিকেলে কলকাতার ফ্লাইট ধরেন সূর্য। ফ্লাইট ছিল ছ’টা পাঁচে। ফ্লাইট ঠিক সময়ই টেক অফ করে। কিন্তু টেক অফের দু-তিন মিনিটের মধ্যে পাইলট বুঝতে পারেন ফ্লাইটে যান্ত্রিক গোলযোগ আছে। ফ্লাইট ফের চেন্নাই এয়ারপোর্টে এমারজেন্সি ল্যান্ডিং করে। তার পর অন্য একটি ফ্লাইট সেই প্লেনের যাত্রীদের নিয়ে চেন্নাই থেকে রওনা দেয়। সেটি টেক অফ করে ন’টা ষোলো মিনিটে। দ্বিতীয় ফ্লাইটেও সূর্য ছিলেন। আমরা সিটে ওনার ল্যাপটপ পেয়েছি, লাগেজ গুলো ‘লাগেজ সেকশনে’ পাওয়া যায়। এছাড়া ওনার পাশে যে ভদ্রলোকের সিট ছিল, তিনিও সূর্যকে সিটে দেখেছেন।”

এতক্ষণ রাহুল মন দিয়ে নিশার কথা শুনছিল। এবার বলল, “কিন্তু সেই ভদ্রলোকটি সূর্যকে চিনলেন কি করে?
নিশা ধমকের সুরে বললেন, “আরে, সূর্যের ফটো দেখে তিনি আইডেন্টিফাই করেছেন।”
সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় পায়ের শব্দ শুনতে পেলেন তাঁরা। ঘাড় ঘোরাতেই দেখলো রাহুলের মা অর্থাৎ নিশার মাসিমণি দু গ্লাস ফলের রস নিয়ে ঢুকলেন। বললেন, “কীরে, নিশা, দিদি আর জামাইবাবু ভালো আছে তো?”
নিশা একদিকে ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানাল।

“তোর আসা মানেই কোনও নতুন কেস, কী দরকার বাবা এই উটকো হ্যাপার? এই জন্যই বলি, ব্যাঙ্কের চাকরিটা নে। জীবনটা শান্তিতে কাটবে।”
নিশার কাছে এর কোনো উত্তর ছিলো না। তাই রাহুল এগিয়ে এলো নিশাকে বাঁচাতে। বলে, “তোর মা ওই এক ব্যাঙ্কে বসে বসে কাজ করতে জানেন। কোনও অ্যাডভেঞ্চার নেই।”
“হ্যাঁ, তোর ওই অ্যাডভেঞ্চার ধুয়ে জল খা,” রাহুলের মা দ্রুতপদে প্রস্থান করলেন।
রাহুল গ্লাসটিতে একটা বড় চুমুক দিয়ে বললেন, “ল্যাপটপে কিছু পেলি?”
“নাথিং” সংক্ষিপ্ত উত্তর নিশার।
“সূর্যের বাড়ির লোকের কাছ থেকে নোটিসেবল কিছু পেলি?”
নিশা চুমুক দিতে দিতে বললেন, “সাব ইনস্পেক্টর সাহা গিয়েছিলেন রুটিন এনকোয়ারি করতে। সেরকম কিছু পেলে নিশ্চয়ই বলতেন।”
“আমার মনে হয়, সূর্যের বাড়িতে আমার একবার যাওয়া উচিত,” রাহুল বললেন।
সম্মতি দিয়ে নিশা বললেন, “বেশ, ঠিক আছে, সন্ধের দিকে ঘুরে আসা যাবে।”

শেষে সাতটা নাগাদ নিশা রাহুলকে নিয়ে সূর্যের বাড়িতে এসে হাজির হলেন। বাড়িটা বেশ বড়ো, তিনতলা। সামনে গাড়িবারান্দায় একটি গাড়ি রাখা। অন্ধকারে বাড়িটার অবস্থা খুব ভালো বোঝা যাচ্ছে না। শুধু ঝুলবারান্দা থেকে আসা আলোগুলো দেখা যাচ্ছে। নিশা তিনবার বেল বাজানোর পর একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক দরজা খুললেন।
“আজ্ঞে, কাকে চাই?”
“রমেন বাবু বাড়িতে আছেন?”
“হ্যাঁ”
“বলুন, বিধাননগর থানার ও সি এসেছেন।”
“আসুন আপনারা।”
একটা বড় ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকলেন মিমিরা।
“বসুন আপনারা, আমি বাবুকে ডেকে দিচ্ছি।”

ড্রয়িংরুমের একদিকে সোফাসেট, অন্যদিকে বড় একটা শোকেস। তাতে রাশি রাশি বই সাজানো আছে। দেওয়ালে এল সি ডি লাগানো। সাদা পাঞ্জাবি পরে একজন ঢুকলেন। ইনিই সম্ভবত সূর্যের বাবা রমেন রায়চৌধুরী। বয়স আন্দাজ পঞ্চান্নের ওপরে, মুখে খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি। পিছনে একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা ঢুকলেন। মুখের দিকে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, ইনি দুদিন ধরে অনবরত কেঁদেছেন।
রমেনবাবু নিশাকে নমস্কার জানিয়ে সোফায় বসলেন। মুখে একটা বিষণ্নতা লেগে আছে, ” আপনারা চা নেবেন তো? আমি চা বলছি।”
নিশা সঙ্গে-সঙ্গেই না করলেন। এই শোকাহত দম্পতিকে ব্যতিব্যস্ত না করাই ভাল।
নিশা রাহুলের পরিচয় দিল, ” ইনি রাহুল বিশ্বাস, আমাকে এই কেসের ব্যাপারে সাহায্য করছেন।” নিশা সাধারণত কাজের জায়গায় নিজের ব্যক্তিগত পরিচয়টা গোপনই রাখে।

সূর্যের মা বাবা রাহুলের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, বোধ হয় বয়স বোঝার চেষ্টা করলেন। রাহুলের অবশ্য এসব সহ্য হয়ে গিয়েছে, তাই সে তাড়াতাড়ি কাজের কথায় ঢুকতে চাইলো। ভদ্রমহিলার উদ্দেশ্যে রাহুল বলল, “আপনিই সম্ভবত সূর্যের মা? আপনার নামটা জানা হয়নি।”
“আমার নাম মীনাক্ষী রায়চৌধুরী।”
” আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করবো, ভেবে উত্তর দেবেন।”
ভদ্রমহিলা মাথা নাড়লেন।
“এবাড়িতে আপনারা ছাড়া আর কে কে আছেন?”
” আমরা ছাড়া সূর্যের কাকা-কাকিমা আছেন। এছাড়া রাঁধুনী আর দারোয়ান। ”
রাহুল আবার শুরু করল, ” চেন্নাইতে যাওয়ার কদিন আগে সূর্যকে কি খুব অন্যমনস্ক দেখতেন?”
” না অন্যমনস্ক নয়। বরং বেশ খুশিই দেখতাম। তবে একটু টেনশনও বোধ হয় ছিল, কিন্তু সেটা বিজ্ঞান সম্মেলনে যাওয়ার জন্য। এর আগে তো কোনদিন যায়নি, তাই।”
” আচ্ছা,  ওঁর কোনও বন্ধুবান্ধব ছিল না?”
” না, সেরকম কারও সাথে বেশি মিশত না। আর বন্ধু থাকলেও আমরা জানি না। পাড়ায় কোনোদিন মিশতে দেখিনি।”
” ওঁর কোনো শখ বা হবি কিছু ছিল?”
” না, সেরকম কিছু নয়। তবে মাঝে মাঝে ছড়া লিখত।”
” আচ্ছা, আপনাদের এখানে একজন বাচ্চা আছে, সে কোথায়?”
” বাচ্চা কে? ও হ্যাঁ, কাজু আমার দেওরের ছেলে। কিন্তু আপনি….”
” শো-কেসটার নীচে একটা আঁকার খাতা পড়ে আছে। ওকে একটু ডাকা যাবে?”

সূর্যের মা কাজুকে ডাকতে চলে গেলেন। রাহুল এবার তাকাল রমেনবাবুর দিকে, “আচ্ছা, আপনার প্রোফেশনটা জানা হয়নি।”
” আমি একজন পি. ডব্লু. ডি অফিসার। বছর খানেক হল আমি একজন রিটায়ার্ড পার্সন।”
” অফিসের লোক কিংবা বাইরের কারও আপনার ওপর আক্রোশ আছে? এরকম কারও কথা মনে পড়ছে?”
সূর্যের বাবা প্রবলভাবে মাথা নাড়লেন, ” না, না, সেরকম কাউকে মনে পড়ছে না। আমার মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাট চাকরিজীবন ছিল, আর এ বাড়ির উপর অাক্রোশ থাকবে, এমন লোকের কথাও মনে পড়ছে না।”
ঠিক সেই সময় একটি বাচ্চার গলা শোনা গেল, “আমায় কে ডেকেছে?”
বাচ্চা টা ঘরে ঢুকতেই রাহুল বলল, “আমি ডেকেছি, খুব অন্যায় করে ফেলেছি কি?”
বাচ্চাটা ঠিক সেভাবেই জবাব দিল, “হ্যাঁ, খুব অন্যায় করেছ, তুমি জানো না এটা আমার পড়ার সময়?”
” ওঃ! একদম ভুল হয়ে গিয়েছে। আসলে সূর্যদা বললেন একটা খবর তোমায় দিতে, তাই ডাকলাম।”
” সূর্যদা তোমায় বলেছে, কী বলেছে?” অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল কাজু।
” সূর্যদা আমাকে বললেন তাঁর আসতে  একটু দেরি হবে, যেন তোমাকে সেটা জানিয়ে দিই।”
” কিন্তু তোমাকে কেন বলল? ফোনে বলত?”

কাজু যে এইরকম একটা যুক্তি দেবে, সেটা রাহুল নিজেও বোধ হয় ভাবেনি। তাই মিথ্যে করে বলল, ” আসলে সূর্যদা খুব ব্যস্ত তো, তাই আমাকে বলে দিতে বললেন। আর সূর্যদাকে যদি তোমার কিছু বলার থাকে, তা হলে আমাকে বলতে পার। আমি বলে দেব।”
কাজু দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ” তিন, পনেরো, তেরো, পাঁচ, আর উনিশ, আট, এক, আঠেরো, ষোলো মনে করে বলে দিও।”
কাজুর এই কথাগুলো ঘরটাকে নিঃশব্দ করে তুলল। এরই মাঝে কাজু দৌড়ে দোতলায় চলে গেল।
একরাশ নিস্তব্ধতার মধ্যে রাহুলই প্রথম মুখ খুলল, ” চলুন সূর্যের ঘরটা একবার দেখা যাক।”

ঘরটা দোতলায়, বেশ বড়ো। ঘর জুড়ে উঁচু উঁচু বইয়ের তাক। সাইডে একটা বড়ো টেবিল। তার উপর ইলেকট্রিকের টুকিটাকি যন্ত্রপাতি। এছাড়া খাট আর একটা ছোটো টিভি। তার উপর একটা ছোটো পেনদানি আর একটা মিনি ক্যালেন্ডার, যার প্রতিটা ডেট পরিবর্তন করতে হয় এবং প্রত্যেকটা ডেট কার্ডের ওপর রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি সুন্দর করে আঁকা। সব মিলিয়ে ক্যালেন্ডারটা ভারী সুন্দর। রাহুল দেখল, ক্যালেন্ডারে এখনও ১০ ই ফেব্রুয়ারী দেখাচ্ছে। তার মানে কেউ ডেটটাও বদলায়নি।

ফেরার পথে সূর্যের মা রাহুলের হাতটা ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন, “বাবা, তুমি আমার ছেলেকে যেমন করে হোক বাঁচাও।”
রাহুল এই পরিস্থিতিতে কখনও পড়েনি। তাই ইতস্তত করে বলল, “কাকিমা, এই কেসটা সলভ করা আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। আমি চেষ্টা করবো সূর্যকে আপনার কাছে ফিরিয়ে দিতে এবং আমার বিশ্বাস আমি সেটা পারব।”
সূর্যের বৃদ্ধ বাবা-মাকে আশ্বস্ত করে এসে গাড়িতে উঠল রাহুল। আপন মনে বলল, ‘এঁদের জন্য অন্তত আমাকে পারতেই হবে।’
নিশা এতক্ষণ কোনও কথা বলেনি। এবার গাড়িতে উঠে বলল, ” ছেলেটা কী বলল রে?”
“কী বলল সেটাই তো ভাবছি। থানার দিকে চল।  ল্যাপটপ আর লাগেজগুলো পরীক্ষা করা দরকার।”

সূর্যের লাগেজ থেকে জামাকাপড়, ইলেকট্রিক শেভার, কয়েকটি সায়েন্স জার্নাল, এ ছাড়া পারফিউম, হ্যান্ড সোপ ইত্যাদি টুকিটাকি জিনিসপত্র পাওয়া গেল। রাহুল সেগুলোকে খুব মনোযোগ সহকারে দেখলো। এরপর মোবাইল আর ল্যাপটপ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল। ল্যাপটপে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ডেটা পাওয়া যায়নি। তাতে শুধুমাত্র কয়েকটি সায়েন্স জার্নাল লোড করা হয়েছে। মোবাইলে সিমকার্ড নেই। মেমোরিও পুরো ফাঁকা।
বিশ্বাস বলল, “এই সবকটা জিনিসই সূর্যের, ওঁর মা-বাবা এসে আইডেন্টিফাই করে গিয়েছেন।”

রাহুল যখন চেয়ার ছাড়ল, ঘড়ি তখন সাড়ে দশটার কাঁটা ছুঁয়েছে।
“নিশা চল, আজকের মতো কাজ শেষ। তবে কাল সকালে আবার বেরোতে হতে পারে।”
“কোথায় বেরোবি কাল?” নিশা আগ্রহী হয়ে বললেন।
“সেটা কাল সকালে বলব। আপাতত শুধু একটাই কাজ। চকোলেট খাওয়া আর চিন্তা করা।”

নিশা আজ সকাল সকাল রাহুলের বাড়ি রওনা দিয়েছে। ওর মন উত্তেজনায় টানটান। রাহুল যখন এই কেসটাকে এত সিরিয়াসলি নিয়েছে, তখন নিশার চিন্তা অনেকটাই কমেছে। তাই আজ তাড়াতাড়িই চলে এসেছে। কিন্তু ঘরে নিশার উৎসাহ ঠিক ততটাই কমে গেল। দেখলেন, রাহুল এখনও কোলবালিশ, চাদর জড়িয়ে শুয়ে রয়েছে। নিশা অবাক হলেন।
” ভাল করেছিস এখন এসেছিস, তোকে আজ অনেক কাজ করতে হবে,” রাহুল বলল।
” আর তুই কি এভাবেই শুয়ে থাকবি?” রাহুলকে খোঁচা মারলে নিশা।
” যদি শুয়েই কেসটা সলভ হয়, তাহলে শুয়েই থাকব,” পাল্টা উত্তর রাহুলের। ” যাক গে, তুই এখন দেখো চেন্নাইতে যাঁরা কনফারেন্সের অর্গানাইজার ছিলেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলা যায় কিনা। আর সূর্য প্লেনে যে ভদ্রলোকের পাশে বসেছিলেন, তাঁর সঙ্গেও একটু দেখা করব।”
” ঠিক আছে, আমি দেখছি যদি চেন্নাইতে কথা বলা যায়। আর ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে বারোটা নাগাদ কথা বলতে যাব। রেডি হয়ে নিস।”

নিশা শেষপর্যন্ত অর্গানাইজারদের সঙ্গে কথা বলার জন্য কিছুটা সময় চেয়ে নিতে পেরেছেন। নিশা নম্বর ডায়াল করে প্রথমে রাহুলকে পরিচয় করালেন। রাহুল প্রায় ঘন্টাখানেক ফোনালাপ চালাল এবং আরও ঘন্টাখানেক তাকে ইনফরমেশন নেওয়ার জন্য হোল্ড করতে হল। নিশা ফোনের মাঝখানে খিদের টানে উঠে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে উৎসাহভরে জানতে চাইলেন কিছু দরকারি খবর পাওয়া গিয়েছে কিনা।
” কোনটা দরকারি, কোনটা নয় সেটা এখনই বোঝা সম্ভব নয়।” চিন্তিত গলায় উত্তর দিল রাহুল।
” চল, প্রকাশ জয়সওয়ালের বাড়ি যাওয়া যাক।”
নিশার অবাক দৃষ্টি। বললেন, ” তুই কি করে জানলি?”
” আরে এতে এত অবাক হওয়ার কি আছে? আজ সকালে কি আর এমনি এমনি দেরিতে ঘুম থেকে উঠেছি! প্যাসেঞ্জার লিস্ট দেখে নাম বের করা কি খুব সহজ ব্যাপার? চল, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

গাড়ি পার্ক সার্কাস ময়দানের পাশ দিয়ে চলছে। যেতে হবে ১৩১/৩ তিলজলা রোডে।
“নিশা, একটু আশার আলো পেয়েছি। আর তোরও অন্ধকারটা একটু দূর করা দরকার। প্রথমত, সেই তিন, পনেরো, তেরো, পাঁচ, উনিশ, আট, এক, আঠেরো, ষোলো। এই ব্যাপারটা কিছুই নয়, শুধু একটা বাক্য, যা সাঙ্কেতিক ভাষায় বলা। ইংরেজি বর্ণমালাটা মনে আছে নিশা? বর্ণমালার তিন নম্বর বর্ণটা ‘C’, পনেরো নম্বর বর্ণটা ‘0’, এইভাবে সাজালে তেরো হয় ‘M’, পাঁচ হয় ‘E’ আর কথাটা হল স্পেস, এরপর উনিশ, আট, এক, আঠেরো, ষোলো সাজালে হয় ‘SHARP’, পুরোটা হল COME SHARP।
তাড়াতাড়ি এসো, বাচ্চাটা তার দাদাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলেছিল। বাব্বা বুদ্ধি আছে তো! যে নম্বর নিয়ে গবেষণা করে সে নম্বর নিয়ে এমন দু-একটা খেলা খেলতেই পারে।”
” দ্বিতীয়টা হল ল্যাপটপ। যার সার্ভারে ল্যাপটপের থ্রুতে এন্ট্রি নেওয়া হত, তা প্রায় প্রতিদিন গড়ে দুহাজার, তার ল্যাপটপ এখনও এত নতুন থাকবে? বড়জোর ল্যাপটপটা দু-একদিন ব্যবহার হয়েছে। তা ছাড়া, সার্ভারটা কোথায়? মোবাইল ও সিমকার্ড নেই। ফোন মেমরি ফাঁকা করার কী দরকার ছিল? এর একটাই কারণ হতে পারে, দ্বিতীয়বার যখন প্লেন টেক অফ করে তখন সূর্য প্লেনেই ছিলেন না।”
” তা হলে প্রকাশ জয়সওয়াল যে সারাক্ষণ তাঁর পাশে কাটালেন, নামতেও দেখলেন?” প্রশ্ন নিশার।
” এই জায়গাটাই খটকা লাগছে নিশা। হয়তো এমনও হতে পারে, প্লেন দ্বিতীয়বার টেক অফ করার সময় কাউকে সূর্য সাজিয়ে পাঠানো হয়েছিল। তারপর এয়ারপোর্টে নেমে অন্য ফ্লাইট ধরে সে অন্যত্র চলে যায়।”
” কিন্তু সূর্যকে কেন কেউ এভাবে অপহরণ করবে?” রাস্তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন নিশা।
” দ্যাখো, সূর্য যখন চেন্নাই গিয়েছেন, তখন ওই পরিস্থিতিতে তিনি একদম নতুন। তিনি নিশ্চয়ই তাঁর আবিষ্কার নিয়ে কোনও বিজ্ঞানীর রেফারেন্স চাইবেন। হয়তো তাদের মধ্যে কেউ চতুর ছিল। তারা সূর্যের ফর্মুলা চুরি করতে চেয়েছিল, তাই ওঁকে সরিয়ে দিয়েছে।”
” কিন্তু কী করে হবে? সেই আবিষ্কার তো কনফারেন্সে প্রেজেন্ট করা হয়ে গিয়েছে। অন্য কেউ যদি বানায়ও, তা হলেও তো সে ধরা পড়তে বাধ্য।”
” নিশা তুই বুঝতে পারছিস না। ফর্মুলা নিয়ে জিনিসটা তৈরি করে প্রকাশ্যে আনার কি দরকার! কারও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, রেজিস্টার করলেই তো এ টি এম কার্ড, ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ড নিমিষে হাতের মুঠোয় চলে আসবে। বোঝাও যাবে কত টাকা আছে অ্যাকাউন্টে। তারপর তুলে নিলেই হল।”
” কি বলছিস রাহুল, এত বড় চক্রান্ত!”
” সেটাই তো ভাবাচ্ছে নিশা। তা ছাড়া সবাই কত বড়ো বিজ্ঞানী, তাঁদের সবাইকে টাচ করাও সম্ভব নয়। আমাদের হাতে তো কোনও প্রমাণ নেই। এসব তো শুধু অনুমান মাত্র।”

নিশার মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে, কিন্তু তার স্বরে কোথায় যেন হতাশা প্রকাশ পেল। তা হলে কি কেসটা কোনও দিন সলভ হবে না? পাওয়া যাবে না সূর্যকে? রাহুলকে বলল, “কিন্তু তুই যে কাল সূর্যের মা-বাবাকে বললি, ওঁকে ফিরিয়ে আনবি?”
” বলেছি আমি, আর চেষ্টাও করছি। কিন্তু দরজাটা বন্ধ হয়ে আসছে নিশা। যা করার খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।”
গাড়ি ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে তিলজলা রোডের বিশাল অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। রাহুল আর নিশা দোতলায় উঠে ডোরবেল বাজাল। দরজাটা খুললেন একজন মোটা ফরসা মতো ভদ্রমহিলা।
“প্রকাশ জয়সওয়াল আছেন?” নিশা প্রশ্ন করলেন।
” বসুন, আসছেন উনি।”
ভদ্রলোক বড়ো কাউচে বসলেন। বললেন, “বোলেন হামি আপনার কি হেল্প কারতে পারি?”           নিশা নিজের পরিচয় দিল।
ভদ্রলোকের বাড়ির ড্রয়িংরুম বেশ বড়ো, আধুনিক আসবাব দিয়ে সাজানো। ভদ্রলোক যে বেশ রুচিসম্পন্ন, তা ঘরটি দেখলেই বোঝা যায়।

রাহুলই প্রথম প্রশ্ন করল, ” চেন্নাইতে আপনার কে কে আছেন মিস্টার জয়সওয়াল?”
“অলমোস্ট সব লোগই আছেন। হামার বহিন, হামার দুই লাড়কা, সির্ফ হামি আর হামার ওয়াইফই কলকাত্তা মে সেটেলড আছি।”
” আচ্ছা, সেদিন যখন প্লেনে কলকাতায় ফেরার সময় সূর্যকে দেখলেন, তখন কিরকম মনে হয়েছিল?”
” খুভই বিজি ম্যান। টোটাল টাইম ই উনি ল্যাপটপ মে বিজি থা। এয়ার হোস্টেস তিনবার সিটবেল্ট বাঁধনেকে লিয়ে বোলা, উসকে বাদ উনকো শুনাই দিয়া।”
রাহুল আবার কিছু ভাবল। তারপর বলল, “আর দ্বিতীয় বার, মানে, প্রথম প্লেনটি যখন বাতিল হয়, তারপরের ফ্লাইটে?”
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, ” জাদা কুছ নেহি। লেকিন উনি কিতাব পড়ছিলেন।”
” ভাল করে ভাবুন মিস্টার জয়সওয়াল, চেহারায় বা ব্যবহারে কোনো বদল?”

ভদ্রলোক এবার অনেকক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, ” নেহি কুছ নেহি, বাট উনি আমাকে হেল্প কারেছিলেন। মেরা ব্যাগ গির গ্যয়া থা, উনি তুলে দিলেন। ম্যায়নে উসকো থ্যাঙ্কস বোলা, লেকিন উনি কুছু বোলেনি।”
রাহুল বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইল। তারপর হঠাৎ বলল, ” আপনার ব্যাগটা একটু দেখতে পারি?”
মিস্টার জয়সওয়াল অবাক চোখে তাকিয়ে ব্যাগটা আনতে গেলেন।

রাহুলের কানের কাছে এসে নিশা বলল, “ব্যাগটা দেখতে চাইলি কেন?”
এবার রাহুল একটু রেগেই বলল, ” মানুষ অত ব্যস্ততার মধ্যে কারও ব্যাগ তুলে দেয়? তুই কখনও দিয়েছিস? তাহলে ও দিল কেন?”
মিস্টার জয়সওয়াল ব্যাগটা এনে টেবিলের ওপর রাখলেন। ছোটো হ্যান্ডব্যাগ। রাহুল প্রত্যেকটা পকেটে হাত ঢোকাল। কিছু কাগজপত্র, চশমা, সানগ্লাস এসব বেরোতে লাগল। রাহুল প্রত্যেকটা জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। সেই ফাঁকে নিশা ব্যাগটা নিয়ে উলটে পালটে দেখছিল। হঠাৎ নজরে পড়ল, একটা ছেঁড়া ইংরেজি খবরের কাগজের টুকরো। তাতে পেন দিয়ে একটা ছড়া লেখা।
‘ গ্রাম থেকে চলে গেল জমিদার মস্ত,
জমিদারি করতে সে খুবই ব্যস্ত।
গাড়োয়ান আগে গেল দরজাটা খুলতে,
ভুলে গেল সঙ্গে সে চাবিটাই আনতে।

চাবি ছিল শান্তি-র কাচঘরে
তাহা কেউ ভেদ করতে নাহি পারে।
ভেস্তে গেল সব চক্রান্তের ফন্দি
নিজেরই প্রাসাদে আজ জমিদার বন্দি।’

রাহুল কাগজটা পড়ে মিস্টার জয়সওয়ালকে দেখাল, “এটা কি আপনার?”
মিস্টার জয়সওয়াল কাগজটা হাতে নিয়ে দেখে বললেন, ” নেহি, ইয়ে মেরা নেহি হ্যায়।”
রাহুল ব্যাগের ভিতরে জিনিসগুলো ভরে মিস্টার জয়সওয়ালকে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পড়ল। গাড়িতে উঠে নিশা রাহুলকে জিজ্ঞাসা করল, ” কী রে, কাগজটা ওঁর ব্যাগে এল কী করে?”
” এখনও বুঝতে পারলি না, প্লেন যখন এমারজেন্সি ল্যান্ডিং করে তখন সূর্য বুঝতে পেরেছিলেন যে, প্লেনটা যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য নয়, তাঁকে অপহরণ করার জন্য ল্যান্ড করছে। তাই এই চিরকুট তিনি ভদ্রলোকের ব্যাগে দিয়ে দেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যিনি তাঁকে শেষবার দেখেছেন, সবার আগে পুলিশ তাঁর কাছে পৌঁছবেই। তাই এর কাছেই সূর্য রেখে যান তাঁর বাঁচার পথ।”
” তাহলে এখন কি করবি?” উত্তেজনার সাথে বলে নিশা।
” এখন সব সূত্রগুলোকে এক করে নেওয়ার পালা। বন্ধ দরজাকে এখন সজোরে ধাক্কা দিতে হবে। দেখা যাক খোলা যায় কিনা!”
” তুই ধাক্কা দে, আমি অফিসে কেসের রিপোর্ট জমা দিয়ে আসি।”
” তুই এখন কোথাও যেতে পারবি না। তোকেই আমার সবচেয়ে দরকার। তোর রেফারেন্স না হলে তো কোনও কাজই হবে না।” সত্যি বলতে কী, কেসের এই মুহূর্তে নিশারও ঠিক যেতে ইচ্ছা করছে না। তবুও রাহুলের কাছে নিজেকে বাজিয়ে নিল। নিজের গুরুত্ব বুঝে খুশিই হল।

খাওয়া দাওয়া সেরে রাহুল ডিভানে শুয়েছে। নিশা পাশের সোফায় রিপোর্ট লেখায় ব্যস্ত। রাহুলের মুখে উপর ধরা সেই চিরকুটটা, অনেকক্ষণ বিড়বিড় করে কবিতাটা পড়ছে। ঘড়িটা টিকটিক শব্দ করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। পাশের দেওয়ালের টিকটিকিটা একদৃষ্টে ওদের ওপর নজর রাখছে। হঠাৎ রাহুল নিশাকে বলল, ” আচ্ছা, তুই নিজের বাড়ি বলতে কি বুঝিস?”
নিশা রিপোর্ট থেকে মুখ সরাল, ” নিজের বাড়ি বলতে, যে বাড়িতে আমি থাকি।”
” ধ্যাত! যে বাড়িতে থাকিস, সেটা তো মেসোর বাড়ি।”

নিশা একটু অবাক হলো। কিন্তু কথাটাও তো ঠিক, ওটা তো তার বাবার তৈরী বাড়ি। বরং সল্টলেকের ফ্ল্যাটটা তার নিজের টাকায় কেনা। ওটা নিশ্চয়ই তার নিজের বাড়ি। বলল, ” বাড়ি তৈরী করতে যে লোকের কন্ট্রিবিউশন সবচেয়ে বেশি, সেটা হল তার বাড়ি। কী ঠিক?”
রাহুল বলল, ” না, যে বাড়িতে আমার নিজের শাসন চলে সেটাই আমার নিজের বাড়ি।”
” তা হলে, জমিদার সূর্য রায়চৌধুরী। গাড়োয়ান হল সূর্যের সাহায্যকারী। আর চাবি মানে যা দিয়ে দরজা খোলা যায়। কিন্তু কোনও দরজা প্রাসাদের হলে প্রাসাদটা কি বালিগঞ্জের বাড়ি? সূর্যের নয়? ওঁর বাবার তৈরী? ‘নিজের প্রাসাদ’ মানে, সূর্য নিজে বানিয়েছেন এমন কিছু? সূর্য নিজে বানিয়েছেন একমাত্র সার্ভারটা। তা হলে ওই চাবি দিয়ে সার্ভার খোলা যায়, কিন্তু সেটা কী ধরণের চাবি? চাবিটা কোথায় আছে?– শান্তির কাচঘর, ‘শান্তি’- অর্থাৎ শান্তিনিকেতন।
রাহুল এটা ভেবেই নিশাকে ডাকল, “নিশা একটা ফোন করতে হবে। সূর্যের বাড়িতে ফোন করে বল, ওদের বাড়িতে শান্তিনিকেতনের কোনও জিনিস আছে কিনা!”
নিশা বলতে যাচ্ছিল, শান্তিনিকেতন কেন? কিন্তু রাহুলের উত্তেজনা দেখে বলল না।
সূর্যের মা ফোনটা ধরলেন।
” হ্যালো, আমি ও সি নিশা বিশ্বাস বলছি। আচ্ছা, আপনাদের বাড়িতে কি কোনও শান্তিনিকেতনের জিনিস আছে?”
ওপাশ থেকে শব্দ শোনা গেল না। নিশা ফোনটা রাখতেই রাহুল বলল, ” আছে কিছু শান্তিনিকেতনের?”
” আছে, একটা মিনি ক্যালেন্ডার, যেটা সূর্যের ঘরে রাখা। ওটাই শান্তিনিকেতন থেকে এনেছিল।”
ক্যালেন্ডার মানে ডেট। সূর্য ডেট দেখাতে চেয়েছে। তার মানে চাবিটা নম্বর দিয়ে তৈরী। নম্বর মানে সার্ভারে ৩২ পাসওয়ার্ডের যে নম্বরটা দিয়ে সার্ভার খোলা যায়। কিন্তু ডেট মানে তো ৩৬৫ টা দিন। কোন ডেট, কী হতে পারে? রাহুল উত্তর খুঁজছিল নিজের মধ্যে।
এমন সময় নিশার গলা, ” হ্যাঁ রে, আজ তারিখটা কত?”
রাহুল খানিকটা রেগেই গেল, ” ওই যে ক্যালেন্ডার, খুঁজে নে।”
নিশা আরও রেগে গিয়ে বলল, ” দূর, ওই ক্যালেন্ডারে তারিখ খুঁজতে গেলে মাথা ঘোরে। অত ডেটের মধ্যে থেকে খুঁজে নেওয়া। তার চেয়ে আজকের খবরের কাগজটা দে, তারিখ দেখে নিই।”

রাহুল টেবিলের দিকে এগোচ্ছিল পেপারটা নিতে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো মাথায় খেলে গেল, আরে! সূর্যের চিরকুটটাও তো খবরের কাগজ। তার মানে সেটা যে তারিখের, সূর্য কি সেই তারিখের কথাই বলছেন? হ্যাঁ, সেটাই তো বলছেন। শেষ লাইনটা হল ‘ নিজেরই প্রাসাদে আজ জমিদার বন্দি’। এই ‘আজ’ মানে হল, ওই ছেঁড়া খবরের কাগজের দিনটা। লাফিয়ে উঠল রাহুল। পেয়ে গিয়েছে পাসওয়ার্ড। চিরকুটটাতে দেখল, ছেঁড়া কাগজটার এক কোণে লেখা ১৯ শে ফেব্রুয়ারী, ২০১৭। তার মানে ১৯ তারিখের, ০২ মাসের, ২০১৭ সাল। সবটা হলে ১৯০২২০১৭। রাহুল নিশার কাছে এগিয়ে গেল, “থ্যাঙ্ক ইউ নিশা, তুই ডেটটা জানতে না চাইলে হয়তো অন্ধকারটা কাটত না।”
নিশা তো অবাক! এর মাথামুন্ডু কিছুই বুঝল না। রাহুল নিশাকে ব্যাপারটা গোড়া থেকে জানাল, ” নিশা চল, সূর্যের বাড়ির বন্ধ দরজায় করাঘাত হয়েছে। যেমন করে হোক খুলতে হবে। যত দেরি হবে সূর্যকে আমরা হারাব।”

নিশা জানে, এই সময় কেসটা যে কোনও দিকে মোড় নিতে পারে। এক একটা মুহূর্ত এখন খুব জরুরি। গাড়ির ড্রাইভারকে তাড়াতাড়ি চালাতে বলে সিটের উপর মাথা এলিয়ে বসল নিশা। রাহুল তখন থেকে গুম হয়ে রয়েছে। নিশা জানে, এসময় প্রশ্ন করলে কোন উত্তরই পাওয়া যাবে না। কিন্তু রাহুল নিজে থেকে বলতে লাগল, ” পাসওয়ার্ডটা জেনেছি কিন্তু সার্ভারটা কোথায় তার কোনও হদিশ পাইনি।”
” তা হলে আমরা এখন সূর্যের বাড়িতে কেন যাচ্ছি?”
“জানতে যাচ্ছি সার্ভারটা কোথায় আছে। আর সেটা গাড়োয়ান জানে। এই ‘গাড়োয়ান’ হল গিয়ে….”

রাহুল আবার ভাবনায় তলিয়ে গেল। সূর্যের কোনও বন্ধু নেই, পাড়ায়ও মেশে না। সে ক্ষেত্রে ‘গাড়োয়ান’ হতে পারে একমাত্র কাজু।
রাহুল নিশাকে বলাতে নিশা চমকে উঠল, ” কাজু মানে ওই বছর সাতেকের ছেলেটি?”
“বাচ্চা বলে অবহেলা করিস না নিশা। এমনও হতে পারে, সূর্য ওর হাতেই হয়তো শেষ তুরুপের তাসটা রেখে গিয়েছেন।”
“কিন্তু সার্ভারটা পেলেও কি আমরা সূর্যকে খুঁজে পাব?” প্রশ্ন নিশার।
” মনে আছে নিশা, আমি তোকে বলেছিলাম ল্যাপটপ টা সূর্যের নয়, অন্য কারও? ল্যাপটপ টা অপহরণকারীদের কাছে আছে। কারণ একমাত্র ওই ল্যাপটপের মাধ্যমে সার্ভারে নতুন নম্বর রেজিস্ট্রি হয়। আমরা যদি সার্ভারে ল্যাপটপের আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বসাই, তা হলে ল্যাপটপ টা কোথায় আছে, তা বোঝা যাবে।”
” কিন্তু ল্যাপটপের আইডেন্টিফিকেশন নম্বরটা কি তুই জানিস?” নিশা প্রশ্ন করল।
রাহুল মাথা নিচু করল, ” আগে সার্ভারটা তো পাওয়া যাক!”

গাড়িটা সূর্যদের বাড়ির কাছে থামতেই দরজা খুলে ছুটল রাহুল। যেন নতুন কিছু আবিষ্কারের উন্মাদনা। দেশের একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীকে বাঁচানোর জন্য দৌড়, কারও ছেলেকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দৌড়। রাহুল বাড়ির দারোয়ানকে অগ্রাহ্য করেই বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ভিতরে ঢুকে সূর্যের মাকে দেখেই বলল, ” কাজু কোথায় কাকিমা? ডাকুন তাড়াতাড়ি।” সূর্যের মা কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর সোজা দোতলায় উঠে এলেন। কাজুকে নিয়ে নেমে এলেন, কাজুর চোখে যেন বিরক্তির ছাপ।
রাহুল সোজা কাজুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আট, নয়, চার, চার, পাঁচ, চোদ্দ। জিনিসটা কোথায়?”
নিশা অনেক হিসেব করে বুঝতে পারল, এটার মানে ‘হিডেন’। রাহুল হিডেন জিনিসটা খুঁজছে। কাজু রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলল, “জানি না, জানলেও বলব না।”

রাহুল এবার কাজুর কাছে হাঁটু গেড়ে বসল, “বলো গাড়োয়ান, জিনিসটা কোথায়? তুমি না বললে জমিদার খুব বিপদে পড়বে। তুমি কি চাও সূর্যদার কোনো বিপদ হোক? আমি সূর্যদাকে বাঁচাতে এসেছি। আমাকে অন্তত বলো।”
রাহুলের কথাগুলো কানে যেতেই চোখ ছলছল করে উঠল কাজুর।
শুধু ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, ” সূর্যদার বিপদ? কিন্তু সূর্যদা বলেছিল ফিরে এসে ওটা আমাকে গিফট করবে!”
“ওটা তোমারই থাকবে কাজু, তুমি শুধু বলো, সেটা কোথায়?”
ঘরে তখন সূর্যের বাবা-মা, কাকা-কাকিমা সবাই হাজির আর সবাই অপেক্ষা করে আছেন সাত বছরের ছেলেটা কী বলে?
শেষে কাজু মুখ খুলল, ” সেটা ওর দেশে আছে। এর বেশি কিছু সূর্যদা আমাকে বলেনি। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সূর্যদা শুধু এই কথাটাই বারবার বলেছিল।”

রাহুল সোফায় বসে পড়ল। আপন মনে বলতে লাগল, “ওর দেশ, মানে নিজের দেশ। নিজের দেশ কী হতে পারে?”
নিশা বলল, “ওটা কি ওর নিজের নামের দেশ হতে পারে?”
রাহুল তখনও ভাবছে। নিজের নাম, মানে…. আরে! বিদ্যুৎচমকের মত মনে পড়ে গেল। নিজের দেশ মানেই তো সূর্যের দেশ। সূর্যের দেশ….সূর্যের দেশ…. সূর্যের দেশ মানে তো জাপান। জাপান মানে তো…. প্রবল আক্রোশে রাহুল সোফার উপর ঘুষি মেরে ড্রয়িংরুমের সামনের জানলাটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, “আচ্ছা, আপনাদের বাড়িতে জাপানের কোনও ম্যাপ আছে?”
সূর্যের মা-বাবা দুজনেই মাথা নাড়লেন, অর্থাৎ নেই।

কাজুর এবার বিস্মিত প্রশ্ন, “জাপান সূর্যের দেশ কেন?”
নিশা বিজ্ঞের মত বোঝাতে লাগল, “উত্তর গোলার্ধে সূর্যের আলো প্রথম জাপানে….”
কথাটা শেষ হল না। রাহুল ধাঁ করে কাজুকে কোলে তুলে নিল, ” আমি কী বোকা রে! আলোর ব্যাপারটা মাথাতেই আসছিল না। তোর প্রশ্নটাই মাথা খুলে দিল।” রাহুল এবার নিশার দিকে ফিরল।
” নিশা, আমরা জাপানকে সূর্যের দেশ বলি কারণ সেই দেশেই সূর্যের আলো প্রথম পড়ে। এখানেও একই ব্যাপার। সূর্য উঠলে বাড়িতে প্রথম সূর্যের আলো কোথায় পড়ে?”
নিশা একমুহূর্ত ভেবে বলল, ” বাড়ির জানালায়।”
” না রে, জানলা বন্ধ থাকলে সূর্যের আলো তো ঢুকতেই পারবে না। সূর্যের আলো প্রথম পড়বে বাড়ির ছাদে। প্রত্যেক বাড়ির ছাদই হচ্ছে সেই বাড়ির ‘সূর্যের দেশ’। ছাদে চল।”

ছাদে গিয়ে দেখা গেল অনেক ফুলের টব রাখা আছে। তাছাড়া এমনিতে ছাদ ফাঁকা, বাঁ দিকে দেওয়াল ঘেঁষে একটা জলের কল।
রাহুল এদিক-ওদিক তাকাল। তার চোখ গেল চিলেকোঠার দিকে। একটা বিশাল জলের ট্যাংক, সেখান থেকে সারা বাড়িতে জল সরবরাহ করা হয়। চিলেকোঠার দরজা বেয়ে উপরে উঠল রাহুল। ট্যাংকের ঢাকনা খুলে ট্যাংকের ভেতরে তাকাতেই চিৎকার করে উঠল, ” পেয়েছি নিশা, সূর্যের দেশের সূর্য পেয়ে গেছি।”
ট্যাংকের জল কম ছিল বলে সার্ভারটা তুলতে বেশি বেগ পেতে হল না। সেটাকে দুরকম প্লাসটিক দিয়ে ওয়াটারপ্রুফ করা ছিল।
রাহুল সার্ভারটা অন করল। স্ক্রিনে লেখা ফুটে উঠল, ‘ENTER PASSWORD’, রাহুল পাসওয়ার্ড বসাল ১৯০২২০১৭। ওপেন হল সার্ভারটা। তারপর স্ক্রিনে লেখা ফুটল, ‘PRESS IDENTIFICATION NUMBER’।
নিশা বলে উঠল, “এবার কি করবি রাহুল?”

রাহুলের মুখ চোখ তখন উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে, ” নিশা, যিনি প্রত্যেকটা জিনিসকে বর্ণমালার অনুরূপে সাজিয়ে সাংকেতিক ভাষায় প্রকাশ করেন, তিনি ল্যাপটপকেও যে তাই করবেন, ধরে নেওয়া যায়। কারণ এর সুবিধে হল, কোনো জিনিসের নম্বর মনে রাখতে হয় না। প্রত্যেকটাই ফর্মুলা অনুসারে লিখে দেওয়া যাবে, কখনও ভুল হবে না। তা হলে শব্দটা LAPTOP,
বর্ণমালার অনুসারে সাজালে সংখ্যাটা হল বারো, এক, ষোলো, কুড়ি, পনেরো, ষোলো।”
১২১১৬২০১৫১৬ এই সংখ্যাই হল ল্যাপটপের আইডেন্টিফিকেশন নম্বর। সংখ্যাটা সার্ভারে লিখে সার্চ করল রাহুল, এবার শুধু অপেক্ষা। প্রায় দুমিনিট ধরে সার্চ হচ্ছে, রাহুলের যেন তর সইছে না। তারপর সার্চিং শেষ হলে স্ক্রিনে ফুটে উঠল গুজরাটের ম্যাপ, তারমধ্যে একটা জায়গা ব্লাইমোবাইল করছে। রাহুল জায়গাটার নাম দেখল  ‘ভাদোদরা (VADODORA)’।

উঠে দাঁড়াল রাহুল, ” নে, আমার কাজ শেষ নিশা। বলেছিলাম না, আজ তোর অনেক খাটনি আছে। আমার বিশ্বাস, এখানেই সূর্য আছেন। কারণ সার্ভার চালানোর পুরো প্রসেসটা মাত্র দুদিনে ওরা জানতে পারেনি। তোরা সবরকম সতর্কতা নিয়ে অপারেশন শুরু করবি। যেন সূর্যের কোনো ক্ষতি না হয়। আর কাকিমা, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, সূর্য সুস্থ ভাবেই বাড়ি ফিরবেন। আমি চললাম, সূর্যকে নিয়ে আসার পর আমাকে একটা খবর দিস।”
সূর্যের মা রাহুলের হাত ধরে কেঁদে ফেললেন, ” বাবা তুমি না থাকলে আমার সূর্যকে কেউ বাঁচাতে পারত না।”
রাহুল নির্লিপ্ত মুখে উত্তর দিল, “সূর্য বাঁচার জন্য নিজেই পথ তৈরি করে রেখেছিলেন। আমি শুধু সে পথে হেঁটেছি মাত্র। সূর্যের বাঁচার জন্য যদি কেউ কিছু করে থাকেন, তা করেছে সূর্য নিজেই। উনিই আমাকে প্রতি পদক্ষেপে সাহায্য করেছেন।”

বাড়ির বাইরে পা বাড়াল রাহুল। নিশা বলল, “কীরে হেঁটে যাবি, নাকি এই ঠান্ডায় তোকে গাড়ি করে পৌঁছে দেব?”
শুধু গাড়ি! নিশার ইচ্ছে করছিল রাহুলকে এখনই জড়িয়ে ধরে।
কিন্তু রাহুল শুনলে তো!
” গাড়ি তোরই সবচেয়ে বেশি দরকার নিশা। আমি ক্যাব নিয়ে নেব।”
রাস্তায় নামল রাহুল। চারিদিকে কনকনে ঠান্ডা। কিন্তু আজ আর রাহুলের ঠান্ডা লাগছে না, একটা অপার স্নিগ্ধতা ছুঁয়ে যাচ্ছে তার শরীর। হয়তো আজ তার বলার দিন, ” আমি সফল এই সূর্যের দেশে।”

 

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library
Up next
ভালোবাসি এবার যখনই দেখা হবে,সোজাসুজি বলে দেব ভালবাসি।পাষাণের মতো কঠিন ভালবাসি।শুনে যদি তোমারচোখের শিরা ভেজে ভিজুক,শুনে যদি তোমারঠোঁটের নিম্নদেশ কাঁপে কাঁপুক,আম...
স্বপ্নশিশু – সুরজিৎ সী... আজও তোমাকে দেখি রক্তলেখা- প্রাচীরে প্রাচীরে মধ্যবিত্তের দেওয়ালে ইলেক্ট্রিক খুঁটিতে চায়ের দোকানে দৈনিক আনন্দবাজারের পাতায় পাতায়। গাছের বাকলে, শ...
চোখ মেলেছে এ রাতের জানালায়... -শীর্ষেন্দু মন্ডল ট্রেনের জানালায়, জানিনা এভাবে শহরকে ছেড়ে যাওয়া ঠিক কিনা, হয়তো সমীচীন। দূরে আলোগুলো কেমন যেন শরীরকে স্পর্শ করে যায়, বুকে খেলে যা...
FAULTS IN OUR STARS – মধুর্পণা বৃষ্টি ঘোষ... এক মরা জীবকে ভালবেসেছ এক পক্ষকাল; হৃদযন্ত্রকে হৃদয় করেছে স্নেহের ওম। পাথরগুঁড়ো জড়ো করে নরম কাদায় আলতো দু'টো আঙুলে নতুন আকার; মাঝ ব্রিজের মা...
নায়কোত্তম অরিন্দম – অস্থির কবি... "নায়ক" এমন একটা সিনেমা যা সত্যজিৎ বাবু ও উত্তমকুমারের জীবনে একটা মাইলস্টোন। অনেকে ভাবেন সত্যজিৎ রায়ের জীবনে কম, উত্তমের জীবনে বেশী। এটা সম্পূর্ণ ভুল। ...
তবু ভালোবাসি – সায়ন্তনি ধর... ।। ১।। -“হ্যালো মা, আমি সুমি বলছি। আমরা পৌঁছে গেছি, তুমি চিন্তা কর না, রনি সবসময় আমার সাথেই আছে” মা কে কথা গুলও বলে ফোনটা রেখে আবার রনজয় কে ফোন করল স...
আঁধার পেরিয়ে - অদিতি ঘোষ বাতের ব‍্যথায় রীতিমতো কাবু  মিত্তিরগিন্নী কোনরকমে পা টেনে টেনে এসে দাঁড়ালেন মিশ্রভিলার গেটে। কলিংবেলে বার দুয়েক চাপ দিয়েই অধৈর্য্য গলায় ড...
নিজের সঙ্গে দেখা - দেবাশিস ভট্টাচার্য   আজ বিয়ের পঁচিশ বছর সম্পূর্ণ হলো।আমি অনিন্দিতা বসু।  ব্যাংক এর ডেপুটি ম্যানেজার সায়ক বসুর স্ত্রী। নবনীতা বসুর মা। এই এখ...
বসুধার কান্না – গার্গী লাহিড়ী... ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত অবনি নিতে চায় অবসর, উত্তরে বলে বিশ্ব বিধাতা আরো পর আরো পর | কাতর কণ্ঠে ধরা বলে যায় আমার সবুজ সকলই শুকায়, এত অন্যায় এত অবিচ...
লাভ স্টোরি – শ্বেতা আইচ... 'ও দাদা একটু গাড্ডা গুলো বাঁচিয়ে চলুন না, কখন থেকে তো বলছি। কানে যায় না?' 'চুপ কর না প্লিজ টুকি, পাশে সবাই তাকাচ্ছে তো।' 'তুই তো মোটে কথা বলবি ন...
Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment